ভাষা নির্বাচন / Select Language
  • 🇧🇩
    বাংলা মূল ভাষা (Original)
  • 🇺🇸
    English English
এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৭:৩৮ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক একাধিপত্য: ইসরায়েলের অঘোষিত শক্তি বনাম ইরানের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই

মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক একাধিপত্য: ইসরায়েলের অঘোষিত শক্তি বনাম ইরানের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতা কেবল সীমান্ত সংঘাত বা রাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াই নয়, বরং এর গভীরে রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্রের এক বিশাল ভারসাম্যহীনতা। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মহলে এখন জোরালো আলোচনা হচ্ছে যে, ইসরায়েলের পারমাণবিক একাধিপত্য (Nuclear Monopoly) বজায় রাখার প্রচেষ্টাই এই অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অন্যতম প্রধান কারণ।

পারমাণবিক বৈষম্য ও আন্তর্জাতিক দ্বিমুখী নীতি

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে বিশ্বজুড়ে এক ধরনের দ্বিমুখী আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইসরায়েল বর্তমানে গাজায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করলেও তাদের হাতে থাকা পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনায় এক রহস্যজনক নীরবতা বজায় রয়েছে।

অন্যদিকে, ইরানের ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। যদিও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা স্বীকার করেছে যে ইরান বর্তমানে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না, তবুও দেশটিকে নিয়মিতভাবে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে চরম চাপের মুখে রাখা হচ্ছে। এই বৈষম্য মূলত একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের পারমাণবিক একাধিপত্যকে সুরক্ষা দেওয়ার বৈশ্বিক কৌশলেরই অংশ।

ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ও আত্মরক্ষার ঢাল

পারমাণবিক অস্ত্রের শক্তির রাজনীতি বুঝতে গেলে ইতিহাসের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে জাপানের বেসামরিক জনবহুল শহরে পারমাণবিক বোমার ব্যবহার ছিল বর্তমান যুদ্ধ আইনের বিচারে একটি অমার্জনীয় যুদ্ধাপরাধ। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্রকে মূলত একটি ‘স্ট্র্যাটেজিক ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে দেখা হয়, যা কোনো দেশের অস্তিত্ব রক্ষার গ্যারান্টি হিসেবে কাজ করে।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ইসরায়েল ফ্রান্সের সহায়তায় নিজের পারমাণবিক সক্ষমতা গড়ে তোলে এবং পরবর্তী সময়ে বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারকেও এই সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা প্রদান করে। যেকোনো রাষ্ট্র যখন অন্য কোনো বৃহৎ শক্তির পক্ষ থেকে চরম অস্তিত্বের সংকটে বা হুমকির মুখে পড়ে, তখনই তারা ‘ডিটারেন্স’ বা আত্মরক্ষার ঢাল হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের কথা চিন্তা করে।

ইরান ও ইসরায়েল: অলীক ধারণা বনাম কঠিন বাস্তবতা

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে প্রচার করা হয়েছে যে ইরান ইসরায়েলকে ধ্বংস করতে উদ্যত। কিন্তু গত ৪৫ বছরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সংঘাতের ময়দানে ইরান তুলনামূলকভাবে প্যাসিভ বা নমনীয় অবস্থানে ছিল। ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা মূলত তাদের রাষ্ট্রীয় টিকে থাকা (Survival) নিশ্চিত করার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

বাস্তবতা হলো, ইরান বর্তমানে সরাসরি কোনো যুদ্ধ শুরু করেনি, বরং তারা একটি প্রচ্ছন্ন লড়াইয়ের মোকাবিলা করছে যেখানে দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি মূলত ইসরায়েলের সেই অঘোষিত পারমাণবিক একাধিপত্যকে টিকিয়ে রাখার একটি বৃহত্তর লড়াই।

জি-৭ এবং বৈশ্বিক রাজনীতির প্রভাব

জি-৭ রাষ্ট্রগুলো সম্প্রতি ইরানকে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করলেও ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের প্রতি নমনীয় অবস্থান বজায় রেখেছে। বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় গত ১৮ মাসের ধ্বংসলীলা এবং বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি সত্ত্বেও এই পারমাণবিক বৈষম্য নিয়ে নীরবতা বজায় রাখা আন্তর্জাতিক মহলের একটি বড় নৈতিক পরাজয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেনি, বরং ইসরায়েলই ইরানের বিরুদ্ধে প্রচ্ছন্ন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। পারমাণবিক অস্ত্রের এই ভারসাম্যহীনতা মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

কেন এই সংঘাত থামছে না?

বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

একপাক্ষিক আধিপত্য: ইসরায়েল চায় মধ্যপ্রাচ্যে তারাই একমাত্র পারমাণবিক শক্তি হয়ে থাকবে, যাতে অন্য কোনো দেশ তাদের শাসন বা সামরিক নীতিতে চ্যালেঞ্জ করতে না পারে।

মার্কিন সমর্থন: আন্তর্জাতিক আইন ও যুদ্ধাপরাধের প্রশ্ন থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র অন্ধভাবে ইসরায়েলের পারমাণবিক গোপনীয়তাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

অস্তিত্বের লড়াই: ইরানের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা মূলত মার্কিন ও ইসরায়েলি আগ্রাসন থেকে নিজেদের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করার একটি কৌশল মাত্র।

পরিশেষে, পারমাণবিক অস্ত্রের এই অসম বণ্টন এবং একপক্ষের আধিপত্য বজায় রাখার জেদ মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়ংকর ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত না পারমাণবিক সক্ষমতাকে কেন্দ্র করে এই বৈষম্যমূলক রাজনীতির অবসান ঘটবে, ততক্ষণ মধ্যপ্রাচ্যের বালুকারাশি শান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।