ভাষা নির্বাচন / Select Language
  • 🇧🇩
    বাংলা মূল ভাষা (Original)
  • 🇺🇸
    English English
কাজী রাহাত শামস • প্রকাশিত: ২১ অক্টোবার ২০২৬, ১০:০৭ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

অভিযোগের ভিত্তি আছে, কিন্তু প্রতিশোধের আগুনে সমাধান নেই

সৌদি আকাশে হুথি হামলা

অভিযোগের ভিত্তি আছে, কিন্তু প্রতিশোধের আগুনে সমাধান নেই

সৌদি আরবের আকাশ আবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আতঙ্কে। ইয়েমেনের হুথিরা সৌদি বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা বাড়িয়েছে। পাল্টা জবাবে সৌদি আরবও ইয়েমেনে হুথি নিয়ন্ত্রিত স্থাপনায় আঘাত করছে। প্রায় এক দশকের সংঘাত আবার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একটি ভুল সিদ্ধান্ত পুরো আরব অঞ্চলকে নতুন যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

প্রশ্ন হচ্ছে, হুথিরা কেন সৌদি আরবকে আক্রমণ করছে?

তাদের প্রধান অভিযোগ নতুন নয়। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করার পর থেকে হুথিরা রিয়াদকে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রধান পক্ষ হিসেবে দেখে। তারা অভিযোগ করে, সৌদি-সমর্থিত অবরোধের কারণে ইয়েমেনের বন্দর ও বিমান চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়েছে, অর্থনীতি ধ্বংস হয়েছে এবং ইয়েমেনের মানুষ দীর্ঘ মানবিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে। বর্তমানে তারা বন্দর ও বিমানবন্দরের ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা, তেল ও গ্যাসের রাজস্বের অংশ এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতন পরিশোধসহ বেশ কিছু দাবি সামনে এনেছে। 

এই অভিযোগের একটি ঐতিহাসিক ভিত্তি অবশ্যই রয়েছে। ইয়েমেন যুদ্ধ ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানের ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বহুবার প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা টানতে হবে। অতীতের অন্যায়ের অভিযোগ বেসামরিক বিমানবন্দর, যাত্রীবাহী বিমান কিংবা জনবসতিকে বিপদের মুখে ফেলার অধিকার কাউকে দেয় না। সামরিক ও রাজনৈতিক দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য সাধারণ মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

হুথিদের বর্তমান কর্মকাণ্ডে আরেকটি মাত্রাও রয়েছে। গাজা যুদ্ধের সময় তারা নিজেদের ফিলিস্তিনের পক্ষে প্রতিরোধের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছিল এবং লোহিত সাগরে ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা জাহাজে হামলা চালায়। এখন সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নতুন সংঘাত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর আঞ্চলিক দ্বন্দ্বের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, হুথিরা ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ দাবির পাশাপাশি আঞ্চলিক চাপ সৃষ্টির কৌশলও ব্যবহার করছে। 

সৌদি আরবের অবস্থাও সহজ নয়। বিপুল সামরিক ব্যয় ও আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ছোট, দ্রুতগামী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক হামলা সৌদি বিমান চলাচল, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তাবোধে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। মিসরসহ কয়েকটি আরব দেশ সৌদি নিরাপত্তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। 

মুসলিম বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হলো এই সংঘাতকে সুন্নি-শিয়া কিংবা আরব-ইরান দ্বন্দ্বে পরিণত করা। এতে লাভবান হবে অস্ত্রবাণিজ্য ও আঞ্চলিক শক্তির রাজনীতি, ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মুসলমান।

সমাধান তাই সামরিক বিজয়ে নয়। ইয়েমেনের অবরোধ, বন্দর ও বিমানবন্দরের ব্যবহার, সরকারি কর্মচারীদের বেতন, তেল রাজস্ব এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে একটি আন্তর্জাতিকভাবে তত্ত্বাবধান করা সমঝোতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে হুথিদের বেসামরিক স্থাপনায় হামলা বন্ধ করতে হবে এবং সৌদি আরবকেও ইয়েমেনে নির্বিচার সামরিক প্রতিক্রিয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

মক্কা মদিনার দেশ সৌদি আরব এবং প্রাচীন সভ্যতার দেশ ইয়েমেনের মধ্যে স্থায়ী যুদ্ধ মুসলিম বিশ্বের জন্য কোনো বিজয় আনতে পারে না। অভিযোগের বিচার হতে পারে আলোচনায়, ন্যায়সঙ্গত সমঝোতায়। ক্ষেপণাস্ত্রের ভাষায় নয়।