ভাষা নির্বাচন / Select Language
  • 🇧🇩
    বাংলা মূল ভাষা (Original)
  • 🇺🇸
    English English
প্রকাশিত: ০৭ নভেম্বার ২০২৬, ১২:২১ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ, বিকল্প সংস্কার পরিষদ গঠনের উদ্যোগ

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ, বিকল্প সংস্কার পরিষদ গঠনের উদ্যোগ

গণভোটে অনুমোদিত সংস্কার পরিষদ, নাকি সংসদীয় সংশোধন প্রক্রিয়া, কোন পথে বাস্তবায়িত হবে জনগণের রায়, ১১ দলীয় জোটের নতুন উদ্যোগে সামনে এসেছে রাষ্ট্র সংস্কারের মৌলিক প্রশ্ন।

জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। সরকারের গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির কার্যক্রমে অংশ না নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় বিরোধী জোট সংসদের বাইরে একটি ‘সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন পরিষদ’ গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রস্তাবিত পরিষদ গণভোটে অনুমোদিত সংস্কারগুলোর আলোকে সংবিধানের একটি খসড়া কাঠামো প্রস্তুত করবে, জনমত গড়ে তুলবে এবং সংস্কার বাস্তবায়নের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নির্ধারণে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। পরিষদের আকার, সদস্য এবং কর্মপরিকল্পনা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে জোটের কয়েকজন সংসদ সদস্য, শরিক দলগুলোর প্রতিনিধি, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং জুলাই সনদের অন্য স্বাক্ষরকারী দলগুলোর প্রতিনিধিদের এতে যুক্ত করার চিন্তা চলছে। 

১১ দলীয় জোটের এই উদ্যোগ হঠাৎ গৃহীত কোনো সিদ্ধান্ত নয়। গত ২০ সেপ্টেম্বর জোটটি ছয় দফা দাবি উত্থাপন করে জানিয়েছিল, গণভোটে অনুমোদিত মৌলিক সংস্কারগুলো সাধারণ সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হলে জনগণের দেওয়া রায়ের যথাযথ প্রতিফলন ঘটবে না। তাদের দাবি ছিল, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কথা বলা হয়েছে, সেই পরিষদকেই কার্যকর করতে হবে। জোটের বক্তব্য অনুযায়ী, মৌলিক সাংবিধানিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের ম্যান্ডেট এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য পাশ কাটিয়ে একতরফা উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত হবে না। 

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশের সরকারি গেজেটে বলা হয়েছিল, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা একই সঙ্গে সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করার কথাও আদেশে উল্লেখ ছিল। পরিষদ নিজস্ব কার্যপ্রণালি নির্ধারণ করবে এবং জুলাই সনদ ও গণভোটের ফলাফলের আলোকে সংস্কার প্রস্তাব অনুমোদন করবে। ফলে বিরোধী জোটের দাবি, সংসদীয় বিশেষ কমিটি ওই পরিষদের আইনগত ও রাজনৈতিক দায়িত্বের বিকল্প হতে পারে না। 

অন্যদিকে সরকার বলছে, জুলাই সনদকে পাশ কাটানো নয়, বরং সংসদের সাংবিধানিক ক্ষমতার মধ্য দিয়েই সনদ বাস্তবায়ন করাই তাদের লক্ষ্য। সংবিধান সংশোধনবিষয়ক সংসদীয় বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এর আগে বলেছেন, জুলাই সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে। রাজনৈতিক দল, সাবেক বিচারপতি, আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, জুলাই যোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের মতামত নিয়ে কমিটি সংশোধনী প্রস্তাব প্রস্তুত করবে। এরপর সংবিধান সংশোধন বিল সংসদে উত্থাপন করে আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে তা অনুমোদনের পরিকল্পনা রয়েছে। 

সরকারি বিশেষ কমিটি ইতিমধ্যে একাধিক বৈঠক করেছে। ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত দশম বৈঠকেও জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা, জুলাই যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা, জরুরি অবস্থা জারির বিধান, নারী ও শিশুর সুরক্ষা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়েছে। সরকারপক্ষ মনে করছে, বিরোধী দলের প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে সংস্কার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা উচিত। 

বিরোধী জোটের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের অভিযোগ, সরকার গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে প্রক্রিয়া অনুমোদন করেছে, সেটি অনুসরণ না করে সংসদে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের পথে এগোচ্ছে। জোটের নেতারা বলছেন, সংবিধানের কয়েকটি ধারা সংশোধন এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো পুনর্বিন্যাস এক বিষয় নয়। জুলাই সনদে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন মৌলিক সংস্কারের কথা রয়েছে। এসব বিষয়ে কেবল দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সংস্কারের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

প্রস্তাবিত বিকল্প পরিষদটি কতটা কার্যকর হবে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পরিষদটি সংসদের বাইরে গঠিত হলে তার সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক মর্যাদা কী হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। জোটের নেতারা অবশ্য এটিকে সরাসরি রাষ্ট্রের কোনো বিকল্প প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও জনমত গঠনের একটি মঞ্চ হিসেবে তুলে ধরছেন। প্রস্তাবিত পরিষদ সংবিধানের একটি খসড়া প্রস্তুত করতে পারে এবং প্রয়োজনে প্রতীকী অধিবেশনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে পারে। পরিষদের গঠন ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আগামী সপ্তাহে আসতে পারে বলে জোটের নেতারা জানিয়েছেন। 

তবে কারা পরিষদে যোগ দেবেন, কোন দল আনুষ্ঠানিকভাবে এতে অংশ নেবে এবং এর খসড়া প্রস্তাব সংসদীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে কয়েকজনের নাম আলোচনায় থাকলেও আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের আগে তাদের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা সমীচীন হবে না। নতুন উদ্যোগ সম্পর্কে সরকার বা সংসদীয় বিশেষ কমিটির সরাসরি প্রতিক্রিয়াও এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি।

বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ দৃশ্যমান। একদিকে সরকার সংসদের বিদ্যমান সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে সংশোধনী পাস করতে চাইছে। অন্যদিকে বিরোধী জোট গণভোটে অনুমোদিত পৃথক সংস্কার পরিষদকে কার্যকর করার দাবি জানাচ্ছে। এই বিরোধ যদি রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে সমাধান না হয়, তাহলে একই সংস্কার লক্ষ্যকে সামনে রেখে দুটি সমান্তরাল প্রক্রিয়া তৈরি হতে পারে। তাতে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ এগিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে বৈধতা, কর্তৃত্ব ও জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে নতুন সংকট সৃষ্টি হবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তন, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং কর্তৃত্ববাদ ফিরে আসার পথ বন্ধ করা। সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াই যদি নতুন দলীয় বিরোধ ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় আটকে যায়, তাহলে জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকার ও বিরোধী জোটের সামনে তাই প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে, পরস্পরের বৈধতা অস্বীকার না করে গণভোটের রায়, জুলাই সনদের অঙ্গীকার এবং সংবিধানের গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা। কারণ জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ এখন আর শুধু একটি দলিল বাস্তবায়নের বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কার, রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং জনগণের দেওয়া রায়ের মর্যাদা রক্ষার পরীক্ষা।