এখন সময় ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বার ২০২৬ , ০৮:৪৭ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড: খলিলুর রহমানের ভাষণের সংক্ষিপ্ত

ড. খলিলুর রহমান তাঁর বক্তব্যের শুরুতে ৪০ বছর আগে একই সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করার স্মৃতি তুলে ধরেন। সে সময়ও জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও আস্থার সংকট নিয়ে প্রশ্ন ছিল। তাঁর বক্তব্য, আট দশক পরও প্রশ্নটি রয়ে গেছে, তবে জাতিসংঘ টিকে আছে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং এর বিকল্প না থাকার কারণে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হলোকাস্টের ধ্বংসস্তূপ থেকে যে প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল, আজ তা ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রকে এক ছাদের নিচে এনেছে এবং বহু ক্ষেত্রে যুদ্ধ, সংঘাত ও মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেও কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। 

তিনি বলেন, জাতিসংঘের অস্তিত্ব আছে কি না, বিশ্ববাসী এখন আর সেই প্রশ্ন করছে না। তারা জানতে চাইছে, জাতিসংঘ কাজ করছে কি না। ফিলিস্তিন সমস্যা দশকের পর দশক অমীমাংসিত, আর সুদান, গাজা, ইউক্রেন, মিয়ানমার ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সংঘাত চলছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগও বাড়ছে। এসব সংকটের পরিস্থিতি আলাদা হলেও আন্তর্জাতিক আইন, মানবিক আইন, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং মানবিক সহায়তার নীতিগুলো কোনো ক্ষেত্রেই নির্বাচিতভাবে প্রয়োগ করা যায় না। 

তবে তিনি জাতিসংঘের সাফল্যও তুলে ধরেন। ইরাকে প্রায় ৫০ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষের ঘরে ফেরা, হাইতিতে কঠিন নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যেও জাতিসংঘের কাজ, সংঘাতপূর্ণ দেশে শান্তিরক্ষীদের অবকাঠামো ও সামাজিক পুনর্গঠনে ভূমিকা এবং বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘের মানবিক কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, ব্যর্থতা স্বীকার করতে হবে, কিন্তু যা কাজ করছে তাকেও অবহেলা করা যাবে না। 

এরপর তিনি জাতিসংঘের প্রতি আস্থা ফেরানোর তিনটি পথ তুলে ধরেন। প্রথমত, কোথায় ব্যর্থতা হচ্ছে তা অকপটে স্বীকার করা। দ্বিতীয়ত, জাতিসংঘের কাঠামো ও কার্যপদ্ধতিতে মৌলিক সংস্কার আনা। তৃতীয়ত, প্রতিষ্ঠানটিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা এবং সরকার ছাড়াও নাগরিক সমাজ, বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, তরুণ, নারী, গবেষক ও বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা। 

শান্তি ও নিরাপত্তার প্রশ্নে তিনি নিরাপত্তা পরিষদের বিশেষ দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেন। নিরাপত্তা পরিষদ কার্যকর হলে জাতিসংঘও কার্যকর বলে বিশ্ববাসীর কাছে প্রতীয়মান হয়। কুয়েতের মুক্তি, এল সালভাদরের গৃহযুদ্ধ অবসান, নামিবিয়ার স্বাধীনতা, কম্বোডিয়ার পুনর্গঠন এবং বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষার উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখান যে পরিষদ ঐক্যবদ্ধ হলে কার্যকর ফল দিতে পারে। কিন্তু বড় সংকটে পরিষদ অচল হয়ে গেলে পুরো জাতিসংঘ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে তিনি নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের দায়িত্বশীল নেতৃত্ব ও সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। 

নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনি পরিষদকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল, স্বচ্ছ এবং বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পক্ষে অবস্থান নেন। বিশেষ করে আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বের ঘাটতিকে তিনি অন্যায্য বলে উল্লেখ করেন। সদস্যরাষ্ট্রের সংখ্যায় বৃহত্তম অঞ্চলগুলোর একটি এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষার বড় ক্ষেত্র হওয়া সত্ত্বেও আফ্রিকা স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত। এই বৈষম্য দূর করাকে তিনি জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেন। 

উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বৈশ্বিক ব্যয়ের বৈপরীত্য তুলে ধরেন। উন্নয়ন সহায়তা এক বছরে প্রায় ২৩ শতাংশ কমে প্রায় ১৭৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে, অথচ বিশ্ব সামরিক ব্যয় প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং টানা ১১ বছর বেড়েছে। একই সময়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, এসডিজির অগ্রগতি গুরুতরভাবে পিছিয়ে রয়েছে। তিনি উন্নয়ন সহায়তা বাড়ানো, ঋণের বোঝা কমানো, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা সংস্কার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য গৃহীত আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। 

একই সঙ্গে তিনি অগ্রগতির উদাহরণ দেন। গত দশকে প্রায় একশ কোটি মানুষ নিরাপদ পানির সুবিধা পেয়েছে, বিশ্বের প্রায় ৯২ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে এবং ইন্টারনেট ব্যবহার প্রায় ৪০ শতাংশ থেকে ৭৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তাঁর মতে, এসব সাফল্য প্রমাণ করে যথাযথ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থাকলে এসডিজি অর্জন অসম্ভব নয়। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোকেও অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়াতে হবে, দুর্নীতি, অর্থপাচার ও পুঁজি পাচার রোধ করতে হবে। 

মানবাধিকারের প্রশ্নে তিনি এটিকে শান্তি ও উন্নয়নের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য বলে উল্লেখ করেন। বিশেষভাবে ঘৃণাবাচক বক্তব্য ও সহিংসতায় উসকানি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। নারী, সংখ্যালঘু, অভিবাসী, শরণার্থী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এসব প্রচারের বড় লক্ষ্য। নতুন প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মিথ্যা তথ্য, বিদ্বেষ এবং সহিংসতায় উসকানি দ্রুত ছড়িয়ে দিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে এ সমস্যা মোকাবিলায় সাময়িক ব্যবস্থা নয়, গভীর ও কাঠামোগত উদ্যোগ প্রয়োজন। 

জাতিসংঘ সংস্কার প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য ছিল বিশেষভাবে স্পষ্ট। তিনি বলেন, সদস্যরাষ্ট্রগুলো প্রায়ই বলে সংস্কার সদস্যরাষ্ট্রের নেতৃত্বে হতে হবে, কিন্তু বাস্তবে তারা যথেষ্ট দায়িত্ব নেয় না। কেবল মালিকানা দাবি করলেই হবে না, সক্রিয়ভাবে সংস্কারের দায়িত্ব নিতে হবে। পাশাপাশি যে ক্ষেত্রগুলো ভালোভাবে কাজ করছে, বিশেষত দেশভিত্তিক কার্যক্রম, মানবিক জরুরি সহায়তা, শান্তিরক্ষা ও শান্তি নির্মাণ, সেগুলো আরও শক্তিশালী করতে হবে। স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, নারী ও তরুণদের বেশি সম্পৃক্ত করতে হবে এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে প্রতিযোগিতা বা দায়িত্বের দ্বন্দ্ব কমাতে হবে। 

জাতিসংঘের আর্থিক সংকট নিয়েও তিনি সতর্ক করেন। সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে নির্ধারিত চাঁদা সময়মতো ও শর্তহীনভাবে দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এই অর্থ বিশ্বের সাধারণ মানুষের করের টাকা, ফলে প্রতিটি অর্থের হিসাব ও ফল নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ পর্যাপ্ত অর্থায়নের পাশাপাশি জবাবদিহিও থাকতে হবে। 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই তাঁর ভাষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি এআইকে মানুষের অগ্রগতির শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে দেখলেও কর্মসংস্থান হারানো, ডিজিটাল বৈষম্য এবং আরও উন্নত এআই মানবজাতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেন। তাই প্রযুক্তির দরজা বন্ধ না করে বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, শিল্পখাত, নাগরিক সমাজ ও সরকারকে নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং মানবকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেন। 

সবশেষে ড. খলিলুর রহমান বলেন, জাতিসংঘকে শুধু পরিবর্তনের মধ্যে টিকে থাকলে হবে না, পরিবর্তনকে পরিচালনা করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এজন্য কঠিন সত্য স্বীকার করার বাস্তববাদ, সংস্কারের সাহস এবং সবাইকে সঙ্গে নেওয়ার মানসিকতা প্রয়োজন। তাঁর সভাপতিত্বের মূল লক্ষ্য হবে “Restoring Trust, Managing Transformation”, অর্থাৎ আস্থা পুনর্গঠন ও পরিবর্তনকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা। জাতিসংঘকে ভবিষ্যতের উপযোগী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করাই এই প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য। 

এক বাক্যে ভাষণের মূল কথা:

জাতিসংঘের সংকট অস্তিত্বের নয়, কার্যকারিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার। শান্তি, উন্নয়ন, মানবাধিকার, নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার, আর্থিক জবাবদিহি এবং প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সেই আস্থা নতুন করে অর্জন করতে হবে।