ভাষা নির্বাচন / Select Language
  • 🇧🇩
    বাংলা মূল ভাষা (Original)
  • 🇺🇸
    English English
প্রকাশিত: ০২ মার্চ ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

বাইবেল ও কুরআনে ইরানের বর্ণনা

বাইবেল ও কুরআনে ইরানের বর্ণনা

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যেখানে ধর্মগ্রন্থ কেবল আধ্যাত্মিক নির্দেশিকা নয়, একটি জীবন্ত ঐতিহাসিক দলিলের মতো আচরণ করে। পারস্য বা আজকের ইরান সেই বিরল উদাহরণগুলোর একটি, যার পরিচয় আমরা একসঙ্গে পাই বাইবেল ও কুরআনে। দুই ভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্য, দুই আলাদা ভাষা ও প্রকাশভঙ্গি, কিন্তু বিস্ময়করভাবে একটি ভূখণ্ডকে তারা একই ধরনের এক ঐশী ইতিহাসের ভেতর স্থাপন করেছে। এই মিলটিই আসলে আলোচনার মূল কেন্দ্র।

বাইবেলে ইরান সরাসরি 'ইরান' নামে আসে না, আসে এলাম, মিদীয় এবং পারস্য নামে। উৎপত্তি গ্রন্থে নূহের পুত্র শেমের সন্তান এলাম থেকে যে জাতির উদ্ভব বলা হয়েছে, ঐতিহাসিকভাবে সেটি দক্ষিণ পশ্চিম ইরানের অঞ্চল। অর্থাৎ বাইবেলিক দৃষ্টিতে পারস্য কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক শক্তি নয়, এটি মানবসভ্যতার প্রাচীন বংশরেখার অংশ। পরে ইহুদি জাতির ইতিহাসে যখন এক ভয়াবহ বিপর্যয় আসে, বাবিলনের বন্দিত্ব তখনই প্রথমবার পারস্যের ভূমিকা নাটকীয়ভাবে সামনে আসে। জেরুজালেম ধ্বংস, মন্দির ভেঙে যাওয়া, জাতিগত পরিচয় হারানোর আশঙ্কা, ইহুদিদের কাছে এটি ছিল অস্তিত্ব সংকট। এই অবস্থায় পারস্য সম্রাট সাইরাসের আবির্ভাব ঘটে। বাইবেলের বর্ণনায় তিনি কেবল একজন বিজেতা নন, তিনি এমন এক শাসক যিনি বন্দি ইহুদিদের মুক্তি দেন, তাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে দেন এবং মন্দির পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দেন। আরও আশ্চর্য বিষয়, ইসাইয়া গ্রন্থে ঈশ্বর তাঁকে 'অভিষিক্ত' বলে সম্বোধন করেন, যে শব্দটি সাধারণত নবী বা ঐশীভাবে নির্বাচিত ব্যক্তিদের জন্য ব্যবহৃত। অর্থাৎ বাইবেল এক অ-ইহুদি, অ-ইসরাইলি পারস্য রাজাকে ঈশ্বরের পরিকল্পনার বাহক হিসেবে দেখিয়েছে।

এরপর এসথারের কাহিনি আসে। পারস্য সম্রাটের প্রাসাদে এক ইহুদি নারী রানী হন এবং একটি পরিকল্পিত গণহত্যা ঠেকান। ইহুদি জাতির টিকে থাকা এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। তাদের উৎসব পুরিম সেই স্মৃতির প্রতীক। অর্থাৎ বাইবেলের ইতিহাসে পারস্য কেবল সহনশীল সাম্রাজ্য নয়, ইহুদি অস্তিত্ব রক্ষার নিরাপদ আশ্রয়। দানিয়েল নবীর কাহিনিতে পারস্য শাসক তাঁর ঈশ্বরের প্রতি শ্রদ্ধা ঘোষণা করেন। এখানে পারস্যকে এমন এক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখা যায়, যার ক্ষমতা আধ্যাত্মিক সত্যের বিরোধী নয় বরং তা স্বীকার করতে সক্ষম।

এখন কুরআনের দিকে তাকালে দৃশ্যপট ভিন্ন, কিন্তু অন্তর্গত অর্থ আশ্চর্যভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। সূরা রূমের সূচনায় বলা হয় রোমানরা পরাজিত হয়েছে, কিন্তু অল্প কয়েক বছরের মধ্যে তারা আবার বিজয়ী হবে। ঐতিহাসিকভাবে এটি বাইজান্টাইন (রোমান) ও সাসানীয় পারস্যের যুদ্ধের ঘটনা। সপ্তম শতকে পারস্য সাম্রাজ্য রোমকে পরাজিত করলে মক্কার মুশরিকরা আনন্দিত হয়েছিল, কারণ তারা পারস্যের অগ্নিপূজক ধর্মের সঙ্গে নিজেদের নৈকট্য অনুভব করত। বিপরীতে মুসলমানরা সহানুভূতি অনুভব করত রোমানদের প্রতি, কারণ তারা ছিল আহলে কিতাব, একেশ্বরবাদী ঐতিহ্যের ধারক। তখন কুরআন ভবিষ্যদ্বাণী করে যে রোম আবার জিতবে এবং কয়েক বছরের মধ্যে সত্যিই তাই ঘটে। এখানে লক্ষ্য করার বিষয়: কুরআন কোনো সাম্রাজ্যের স্থায়ী মহিমা ঘোষণা করছে না বরং ইতিহাসের ওঠানামাকে আল্লার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। পারস্য এখানে শত্রু হিসেবে নয় বরং ইতিহাসের পরীক্ষার একটি পর্যায় হিসেবে উপস্থিত।

এই দুই ধর্মগ্রন্থের পাঠ একত্রে পড়লে একটি গভীর দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। বাইবেলে পারস্য এমন এক শক্তি, যাকে স্রষ্টা বন্দি জাতিকে মুক্ত করার জন্য ব্যবহার করেন, কুরআনে পারস্য এমন এক শক্তি, যার উত্থান পতনের মাধ্যমে আল্লাহ মানবজাতিকে ইতিহাসের শিক্ষা দেন। একটি গ্রন্থে পারস্য মুক্তিদাতা, অন্যটিতে পরীক্ষার উপকরণ। কিন্তু উভয়ক্ষেত্রেই এটি খোদাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ শক্তি নয়। এখানে ইতিহাসকে কেবল রাজনীতি বা সামরিক ক্ষমতার ফল হিসেবে দেখা হয়নি। এটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিধানের অধীন।

এই মিলের আরেকটি গভীর দিক আছে। বাইবেলের কাহিনিতে ইহুদি জাতি বুঝতে শেখে যে তাদের রক্ষক সবসময় তাদের নিজেদের জাতির ভেতর থেকে আসবে না। কখনো ঈশ্বর বহিরাগত শক্তিকেও ব্যবহার করতে পারেন। কুরআনের সূরা রূম একই শিক্ষা দেয়: মুমিনদের আনন্দ বা দুঃখ সাম্রাজ্যের স্থায়ী আধিপত্যের উপর নির্ভর করে না। বিজয়-পরাজয় আল্লাহর নির্ধারিত সময়চক্রের অংশ। উভয় ধর্মগ্রন্থ ইতিহাসকে একটি নৈতিক নাট্যমঞ্চ হিসেবে দেখে, যেখানে সাম্রাজ্যগুলো অভিনেতা মাত্র।

এই কারণে পারস্য বা ইরান ধর্মীয় ইতিহাসে এক অদ্ভুত প্রতীক হয়ে ওঠে। এটি কেবল একটি ভূগোল নয়, এটি এমন এক উদাহরণ যেখানে মানব ক্ষমতা ও ঐশী ইচ্ছা পরস্পরকে অতিক্রম করে না বরং একে অন্যকে ব্যাখ্যা করে। বাইবেল দেখায়, ঈশ্বর এক বিদেশি সম্রাটের হাত দিয়ে একটি জাতিকে মুক্ত করেন। কুরআন দেখায়, ঈশ্বর সাম্রাজ্যের যুদ্ধের মধ্য দিয়েও বিশ্বাসীদের আশা ও ধৈর্যকে পরীক্ষা করেন। দুই ক্ষেত্রেই শিক্ষা এক: ইতিহাসের শেষ কর্তৃত্ব মানুষের নয়।

ফলে একটি গভীর উপলব্ধি তৈরি হয়: ধর্মগ্রন্থের দৃষ্টিতে কোনো জাতি স্থায়ীভাবে পবিত্র বা অভিশপ্ত নয়। কখনো একটি শক্তি ন্যায়ের মাধ্যম, কখনো একই শক্তি পরীক্ষার কারণ। পারস্যের বর্ণনায় আমরা দেখি ঈশ্বর ইতিহাসকে কেবল ঘটনাপ্রবাহ হিসেবে নয়, নৈতিক শিক্ষার ধারাবাহিকতা হিসেবে পরিচালনা করেন। তাই বাইবেল ও কুরআন একসঙ্গে পড়লে পারস্যের কাহিনি রাজনৈতিক আলোচনা থেকে সরে এসে এক আধ্যাত্মিক ইতিহাসে রূপ নেয়। যেখানে সাম্রাজ্য আসে ও যায়, কিন্তু মানুষের জন্য শিক্ষা থাকে: ক্ষমতা নয়, শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রক হচ্ছে সেই অদৃশ্য বিধান, যাকে ধর্মগ্রন্থ 'আল্লার ইচ্ছা' বলে পরিচয় দেয়।

নিউইয়র্ক, ফেব্রুয়ারী ০২, ২০১৬