প্রকাশিত: ২১ আগষ্ট ২০২৬ , ০৬:৪০ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যমকে বলা হয় ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ (Fourth Estate) এবং সাংবাদিকদের অভিহিত করা হয় ‘সমাজের দর্পণ’ হিসেবে। বর্তমান একবিংশ শতাব্দীতে আমরা তথ্যপ্রযুক্তির এক অভাবনীয় বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যা সাংবাদিকতার চিরাচরিত রূপটিকে আমূল বদলে দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), আধুনিক এডিটিং সফটওয়্যার এবং ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মতো প্রযুক্তি সংবাদ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ এবং মুহূর্তের মধ্যে তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার কাজকে অবিশ্বাস্য রকম সহজ ও দ্রুততর করেছে। তবে প্রযুক্তির এই অবাধ বিকাশ মিডিয়া জগতের সামনে যেমন অবারিত সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, ঠিক তেমনি তৈরি করেছে এক জটিল ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। গতিশীল এই তথ্যপ্রবাহের যুগে সত্য ও মিথ্যার মধ্যবর্তী দেয়ালটি ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে, যা সাংবাদিকদের পেশাদারিত্ব ও নৈতিক দায়িত্বকে এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করেছে।
প্রযুক্তির আশীর্বাদ ও সংবাদ মাধ্যমের রূপান্তর
ডিজিটাল প্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে সংবাদ এখন আর নির্দিষ্ট কোনো সময় বা কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই। সিটিজেন জার্নালিজম বা নাগরিক সাংবাদিকতার উত্থানের ফলে যেকোনো সাধারণ মানুষই এখন ঘটনার তাৎক্ষণিক সাক্ষী ও প্রচারক হতে পারছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য বিশ্লেষণ, ডেটা মাইনিং এবং বড় বড় বৈশ্বিক ঘটনার গতিপ্রকৃতি ট্র্যাক করা সম্ভব হচ্ছে। ক্লাউড প্রযুক্তির কল্যাণে দুর্গম অঞ্চল থেকেও সাংবাদিকরা তাদের প্রতিবেদন সরাসরি সেন্ট্রাল সার্ভারে পাঠাতে পারছেন। এর ফলে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্যপ্রাপ্তি এবং তা প্রকাশ করার গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখছে।
ভুয়া খবর (Fake News) ও
ডিপফেক : সত্যের নতুন শত্রু
প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতার একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। বর্তমানে ইন্টারনেটে তথ্যের গতি যত বেড়েছে, তার চেয়েও দ্রুত গতিতে ছড়াচ্ছে গুজব ও ভুয়া খবর (Fake News)। রাজনৈতিক ফায়দা লোটা, সাম্প্রদায়িক উসকানি তৈরি কিংবা করপোরেট স্বার্থে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্যকে সংবাদের মোড়কে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এর চেয়েও বড় আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে 'ডিপফেক' (Deepfake) প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে যেকোনো ব্যক্তির কণ্ঠস্বর, মুখমণ্ডল এবং শারীরিক অঙ্গভঙ্গি অবিকল নকল করে নিখুঁত কিন্তু সম্পূর্ণ মিথ্যা ভিডিও বা অডিও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। একজন প্রথম সারির রাজনীতিক, সামাজিক ব্যক্তিত্ব বা সাধারণ মানুষের নামে এমন সব বিভ্রান্তিকর বক্তব্য বা দৃশ্য তৈরি করা হচ্ছে, যা খালি চোখে সাধারণ মানুষের পক্ষে ধরা অসম্ভব। এই ধরনের প্রযুক্তি জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলছে।
সাংবাদিকদের বর্ধিত দায় ও দায়িত্ব
এই জটিল বাস্তবতায় সাংবাদিকদের দায়িত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীল এবং গুরুভার হয়ে উঠেছে। এখন শুধু সংবাদ সবার আগে প্রচার করাই মূল কৃতিত্ব নয়, বরং প্রচারিত সংবাদটি কতখানি সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ, তা নিশ্চিত করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তির অপব্যবহার রুখতে সাংবাদিকদের নিজেদেরও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে দক্ষ হতে হবে।
১. ফ্যাক্ট-চেকিং বা তথ্য যাচাইকরণ: বর্তমান যুগে সংবাদ প্রকাশের পূর্বশর্তই হলো মাল্টিপল সোর্স ভেরিফিকেশন বা বহুস্তরীয় তথ্য যাচাই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভেসে আসা কোনো তথ্য বা ছবিকে সরাসরি সংবাদ হিসেবে প্রকাশ না করে, ডেডিকেটেড ফ্যাক্ট-চেকিং টুলস ব্যবহার করে তার সত্যতা নিশ্চিত করা সাংবাদিকদের প্রাথমিক দায়িত্ব।
২. নৈতিকতার প্রশ্নে আপসহীনতা: প্রযুক্তির যুগে কাটতি বা 'ক্লিকবাইট' সংস্কৃতির পেছনে না ছুটে সংবাদের গুণগত মান বজায় রাখা জরুরি। চাঞ্চল্যকর কিন্তু অসত্য বা অর্ধসত্য তথ্য পরিবেশন থেকে বিরত থেকে নৈতিকতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড বজায় রাখতে হবে।
৩. ডিজিটাল লিটারেসি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা: ডিপফেক বা এডিটেড কন্টেন্ট চেনার জন্য সাংবাদিকদের আধুনিক ফরেনসিক টুলস এবং প্রযুক্তির হালনাগাদ জ্ঞান অর্জন করতে হবে। মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চেনার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শিখতে হবে।
৪. জনসচেতনতা তৈরি: সাংবাদিকরা কেবল সংবাদ পরিবেশনই করবেন না, বরং কোন তথ্যটি গুজব এবং কীভাবে সাধারণ মানুষ ভুয়া খবর চিনতে পারবে, সে বিষয়েও সমাজকে সচেতন করবেন।
তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনশীল এই যুগে সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়, এটি সমাজের এক অতন্দ্র প্রহরী। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, মানুষের বিবেক, প্রজ্ঞা এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতার বিকল্প কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হতে পারে না। আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ও ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করে, ভুয়া খবর ও ডিপফেকের মতো আধুনিক চ্যালেঞ্জগুলোকে সাহসের সাথে মোকাবেলা করাই আজকের সাংবাদিকদের প্রধান ব্রত। বস্তুনিষ্ঠতা ও সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের এই আপসহীন ভূমিকাই একটি সুস্থ, সচেতন এবং প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণের পথকে সুগম রাখবে।