প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বার ২০২৬ , ০৭:১০ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
বিশ্ব রাজনীতির অস্থির সময়ে নিউইয়র্কে ঢাকা, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’, রোহিঙ্গা, জলবায়ু ও নতুন সম্পর্কের বার্তা
বিশ্ব রাজনীতির গভীর মেরুকরণ, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে নিউইয়র্কে বসেছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন। এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য শুধু আরেকটি বার্ষিক কূটনৈতিক সমাবেশ নয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে, আর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক মঞ্চে বাংলাদেশের বক্তব্য তুলে ধরবেন। ফলে এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির আন্তর্জাতিক পরিচয় তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ ১৮ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর। মূল সাধারণ বিতর্ক শুরু হবে ২২ সেপ্টেম্বর এবং চলবে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, পরে ২৮ সেপ্টেম্বর আবার অধিবেশন বসবে। এবারের প্রতিপাদ্য, “Restoring trust, managing transformation: A United Nations that delivers for all.” অর্থাৎ আস্থা পুনর্গঠন এবং পরিবর্তন সামলে সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটিই আলোচনার কেন্দ্রে।
কিন্তু এই আহ্বান এমন সময়ে আসছে যখন বিশ্বব্যবস্থায় আস্থার সংকটই সম্ভবত সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাত, বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জলবায়ু সংকট, ঋণ ও উন্নয়ন বৈষম্য এবং বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন বিশ্ব রাজনীতিকে ভারী করে রেখেছে। ফলে সাধারণ পরিষদের বক্তৃতাগুলো শুধু কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বিভিন্ন রাষ্ট্র নিজেদের অবস্থান ও অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্র হিসেবেও ব্যবহার করবে।
বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্য হলো, প্রায় চার দশক পর আবার একজন বাংলাদেশি সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছেন। ড. খলিলুর রহমান ৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জাতিসংঘের সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল অঙ্গটির সভাপতির আসনে বাংলাদেশের উপস্থিতি ঢাকার কূটনৈতিক দৃশ্যমানতা বাড়িয়েছে। তবে সভাপতির দায়িত্ব একটি জাতীয় প্রতিনিধির ভূমিকাকে ছাড়িয়ে নিরপেক্ষ বহুপাক্ষিক দায়িত্বও বহন করে। ফলে বাংলাদেশের জন্য সম্মানের পাশাপাশি এটি কূটনৈতিক পরিমিতিবোধেরও পরীক্ষা।
এই পটভূমিতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে আসার কথা এবং ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। এটি হবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম জাতিসংঘ ভাষণ। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবর্তন, ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা, বৈশ্বিক শান্তি, দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং রোহিঙ্গা সংকট গুরুত্ব পাবে।
সরকার ইতোমধ্যে পররাষ্ট্রনীতিতে “বাংলাদেশ ফার্স্ট” ধারণার কথা বলছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং উন্নয়ন সুযোগ আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরা হবে। এই ধারণার বাস্তব অর্থ কী, তা প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ এবং দ্বিপক্ষীয় বৈঠকগুলোতে আরও স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের সামনে প্রথম বড় ইস্যু রোহিঙ্গা সংকট। কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক মনোযোগ অন্য যুদ্ধ ও সংকটের দিকে সরে যাওয়ায় রোহিঙ্গা প্রশ্নে কার্যকর অগ্রগতি সীমিত। বাংলাদেশ এখনো বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। সরকার জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে রোহিঙ্গা বিষয়ে আয়োজিত একটি অধিবেশনেও অংশ নেবেন। ঢাকার লক্ষ্য হবে প্রত্যাবাসনের প্রশ্নটিকে আবার আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে ফিরিয়ে আনা এবং মিয়ানমারের পরিস্থিতির সঙ্গে মানবিক সহায়তার প্রশ্নটিকে যুক্ত করা।
দ্বিতীয় বড় বিষয় জলবায়ু। নিম্নভূমির ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, দুর্যোগ এবং জলবায়ু অর্থায়নের প্রশ্ন বাংলাদেশের সরাসরি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। জাতিসংঘ ২৩ সেপ্টেম্বর জলবায়ু কার্যক্রম ও ন্যায়সংগত রূপান্তর নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং ২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অস্তিত্বগত হুমকি নিয়ে পৃথক বৈঠক আয়োজন করছে। বাংলাদেশের জন্য এই দুই আলোচনাই বিশেষ প্রাসঙ্গিক।
তৃতীয় বিষয় অর্থনীতি ও উন্নয়ন। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সূচি নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক সমর্থন চেয়েছে। অর্থনৈতিক সক্ষমতা, রপ্তানি সুবিধা, বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতি এবং উত্তরণের পর সম্ভাব্য সুবিধা হারানোর ঝুঁকি নিয়ে ঢাকার উদ্বেগ রয়েছে। জাতিসংঘ অধিবেশনকে কেন্দ্র করে এই প্রশ্নেও কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে।
এর পাশাপাশি বাংলাদেশের নতুন সরকারের ভারতনীতি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে থাকবে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সম্প্রতি বলেছেন, ঢাকা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুনভাবে বিন্যস্ত করতে চায় এবং বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমেই এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে। অর্থাৎ জাতিসংঘের বহুপাক্ষিক মঞ্চে সরাসরি দ্বন্দ্ব উত্থাপনের পরিবর্তে ঢাকা দ্বিপক্ষীয় পথকেই অগ্রাধিকার দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। ওই
এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান তাই কয়েকটি সমান্তরাল বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে। একদিকে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের দৃশ্যমানতা বেড়েছে। অন্যদিকে দেশের নতুন সরকারকে একই সঙ্গে প্রতিবেশী সম্পর্ক, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ, উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো জটিল বিষয় সামলাতে হচ্ছে।
জাতিসংঘে কোনো একটি ভাষণ দিয়ে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তবে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভাষণটি গুরুত্বপূর্ণ হবে এ কারণে যে আন্তর্জাতিক মহল সেখান থেকে বাংলাদেশের নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ভাষা, অগ্রাধিকার এবং কৌশলের একটি প্রাথমিক ধারণা পাবে।
নিউইয়র্কে এবারের প্রশ্ন তাই শুধু বাংলাদেশ কী বলবে তা নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশ নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করবে। একটি পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার দেশ হিসেবে, একটি অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা রাষ্ট্র হিসেবে, নাকি দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতিতে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তুলতে চাওয়া একটি রাষ্ট্র হিসেবে।
সম্ভবত এই সব পরিচয়ই একসঙ্গে বাংলাদেশের কূটনীতিতে জায়গা পাবে।
আর সে কারণেই ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন নয়, নতুন সরকারের বৈদেশিক নীতির প্রথম বড় আন্তর্জাতিক উপস্থাপনাগুলোর একটি।