কাজী শামসুল হক

প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বার ২০২৬ , ০৬:১৯ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

অর্থনীতির সংখ্যার আড়ালে মানুষের জীবনের হিসাব

অর্থনীতির আলোচনা সাধারণত কিছু সংখ্যাকে ঘিরে আবর্তিত হয়। প্রবৃদ্ধি কত হলো, মূল্যস্ফীতি কত শতাংশ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কোথায় দাঁড়াল, রপ্তানি বাড়ল কি না। কিন্তু অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবটি অনেক সময় এই সংখ্যার আড়ালেই থেকে যায়। একজন সাধারণ মানুষ তার মাসিক আয়ে সংসার চালাতে পারছেন কি না, চাকরিপ্রার্থী কাজ পাচ্ছেন কি না, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারছেন কি না, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কতটা বেড়েছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির প্রকৃত সামাজিক হিসাব।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবির সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ পূর্বাভাসে বাংলাদেশের ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার প্রত্যাশার চেয়ে দুর্বল হতে পারে বলেও সংস্থাটি সতর্ক করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির ওপর জ্বালানি ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির গতি যখন দুর্বল, তখনও জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে না। এই দুইয়ের মধ্যবর্তী চাপটিই সাধারণ পরিবারের জন্য সবচেয়ে কঠিন।

মূল্যস্ফীতি শুধু বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার নাম নয়। আয় একই থেকে গেলে মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এক হাজার টাকায় আগে যে পরিমাণ খাদ্য, ওষুধ, যাতায়াত বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা যেত, এখন তার কম পাওয়া গেলে পরিবারের জীবনমানও কার্যত সংকুচিত হয়। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতির বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি সামাজিক স্থিতি এবং জীবনমানের প্রশ্নও।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের দুর্বলতা। বিনিয়োগ না বাড়লে নতুন শিল্প গড়ে ওঠে না, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না। আবার ব্যবসার অর্থায়ন কঠিন হয়ে গেলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি এবং ঋণ বণ্টনের দুর্বলতা অর্থনীতির উৎপাদনশীল অংশে অর্থপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ব্যাংক সংস্কারের উদ্দেশ্য তাই শুধু হিসাবের খাতা পরিষ্কার করা নয়। সঞ্চিত অর্থ যেন উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং বাস্তব ব্যবসায় পৌঁছায়, সেই সক্ষমতা ফিরিয়ে আনাই হওয়া উচিত এর মূল লক্ষ্য।

জ্বালানি পরিস্থিতি সমস্যাটিকে আরও জটিল করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বৈশ্বিক সরবরাহের অনিশ্চয়তায় তেল ও গ্যাসের দাম উঁচু ও অস্থির রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও স্বীকার করেছে, আন্তর্জাতিক সরবরাহের ধাক্কা এবং দেশীয় জ্বালানি ও এলপিজির মূল্য সমন্বয় মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘায়িত করতে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু পেট্রলপাম্পে থামে না। পরিবহন খরচ বাড়ে, কৃষির সেচ ও যন্ত্রচালনার ব্যয় বাড়ে, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয় পণ্যের দামের মাধ্যমে ভোক্তার ঘাড়েই এসে পড়ে।

এই পরিস্থিতিতে ভর্তুকি কখনো কখনো জরুরি সাময়িক সুরক্ষা দিতে পারে। কিন্তু ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী ভর্তুকি নিজেই সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করে। এডিবিও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জ্বালানির মূল্য সামাল দিতে ব্যবহৃত বিস্তৃত ভর্তুকিকে ব্যয়বহুল বলে উল্লেখ করেছে। 

এবাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান তাই শুধু দাম আটকে রাখা নয়, বরং উৎপাদন বাড়ানো, জ্বালানির উৎস বহুমুখী করা, কৃষি ও পরিবহন ব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়ানো এবং বাজারে অস্বাভাবিক মধ্যস্বত্বভোগী ও সরবরাহ বাধা কমানো।

অর্থনীতির সুস্থতার শেষ বিচার হওয়া উচিত মানুষের জীবনে। প্রবৃদ্ধি বাড়ল অথচ কর্মসংস্থান বাড়ল না, মূল্যস্ফীতি কমার পরও মানুষের বাজারের ব্যাগ হালকা রইল, ব্যাংকে অর্থ থাকল অথচ উদ্যোক্তা ঋণ পেলেন না, তাহলে সংখ্যার উন্নতি মানুষের উন্নতিতে রূপান্তরিত হলো না। বাংলাদেশের সামনে এখন সেই রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতিকে সংখ্যায় ভালো দেখানোর চেয়ে মানুষের জীবনে তার সুফল পৌঁছে দেওয়াই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণের প্রধান লক্ষ্য।