ভাষা নির্বাচন / Select Language
  • 🇧🇩
    বাংলা মূল ভাষা (Original)
  • 🇺🇸
    English English
প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বার ২০২৫, ০১:৩০ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

পি আর পদ্ধতি : জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন

পি আর পদ্ধতি : জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন

বাংলাদেশে ভোটব্যবস্থা নিয়ে যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে পি আর বা প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন। কথাটির সার কথা সহজ। যে দল যত ভোট পায়, মোটামুটি সে অনুপাতে সংসদে আসন পায়। ফলে একেকটি অঞ্চলের ভেতরে কে অল্প ব্যবধানে জিতল বা হারল, তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে জাতীয় ভোটের ছবি। এই ধারণাটি নতুন নয়। ইউরোপ, ওশেনিয়া, আফ্রিকাসহ অনেক গণতন্ত্রে পি আর বহুদিন ধরে চলমান। প্রশ্ন হলো, এটি কি সত্যিই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে? এবং বাংলাদেশের মতো বহুমাত্রিক সমাজে এটি কীভাবে কাজ করতে পারে। উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে পি আর কেমন করে ভোটকে আসনে রূপান্তর করে এবং কোন কোন দেশে এটি ফলপ্রসূ হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়ার ইলেক্টোরাল সিস্টেম ডাটাবেস দেখায়, পি আর একটি বৃহৎ পরিবার। লিস্ট পি আর, ওপেন লিস্ট, ক্লোজড লিস্ট, মিশ্র অনুপাতিক বা এমএমপি, বিভিন্ন রূপ আছে। কিন্তু লক্ষ্য একটি, ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টন। 


নিউজিল্যান্ডের কথা ধরা যেতে পারে। দেশটি ১৯৯৩ সালে রেফারেন্ডামের মাধ্যমে ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট ত্যাগ করে এমএমপি গ্রহণ করে। এমএমপি মানে মিক্সড মেম্বার প্রোপোরশনাল। এখানে একজন ভোটার স্থানীয় একজন প্রার্থীকে ভোট দেন এবং একই সঙ্গে একটি পার্টিকে আলাদা ভোট দেয়। শেষে পার্টি ভোটের অনুপাতে ১২০ আসন ভাগ হয়, আর স্থানীয় আসনগুলোকে সমন্বয় করতে ‘লিস্ট’ আসন যোগ-বিয়োগ করে সামগ্রিক অনুপাত নিশ্চিত করা হয়। ফল হলো জাতীয় ভোটের অনুপাত সংসদী আসনে যথাসম্ভব অভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়। দেশটির নির্বাচন কমিশন ও পার্লামেন্টের সরকারি ব্যাখ্যাগুলোতে এটি স্পষ্ট করে বলা আছে। 


জার্মানিতেও এই এমএমপি বহু দশক ধরে স্থিতিশীলতার সঙ্গে চলছে। জার্মান ভোটারদের দুটি ভোট থাকে। একটি ‘প্রার্থী’কে, আরেকটি ‘পার্টি’কে। শেষ পর্যন্ত পার্টি ভোটই মোট আসনের চাবিকাঠি এবং ওভারহ্যাং বা বাড়তি আসন তৈরি হলে ‘ব্যালান্সিং’ করে অনুপাত ঠিক রাখা হয়। ফলে বহুদলীয় সংসদ গঠন হয়, কিন্তু অনুপাতে বড় ধরনের বিকৃতি দেখা যায় না। এই কাঠামোর পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় এসইইপি/এস ই সি (ACE Project) এবং উইকিপিডিয়ার সুসংহত নোটে। 


নেদারল্যান্ডস সম্পূর্ণ জাতীয় একক আসনভিত্তিক লিস্ট পি আর অনুসরণ করে। সেখানে ‘প্রোপোরশনালিটি’কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। দেশটি কেন একেবারে সারাদেশকে একটি আসন ধরে লিস্ট পি আর নিয়েছে এবং কম থ্রেশহোল্ড রেখে ছোট দলগুলোকে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছে, এ বিষয়ে বিশ্লেষণধর্মী নোট প্রকাশ করেছে ইলেক্টোরাল রিফর্ম সোসাইটি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা থেকেও দেখা যায়, ডাচ মডেল প্রোপোরশনালিটির শুদ্ধতা রক্ষায় কতটা আগ্রহী। 


উত্তর ইউরোপের সুইডেন ও নরওয়ে, দুটি স্থিতিশীল কল্যাণরাষ্ট্র, লিস্ট পি আর ব্যবহার করে এবং ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট’ বা ‘লেভেলিং’ সিটের মাধ্যমে জাতীয় অনুপাত ঠিক রাখে। সুইডেনে ৩৪৯ আসনের মধ্যে ৩১০টি হচ্ছে কনস্টিটুয়েন্সি সিট, বাকিগুলো সমন্বয়ের জন্য। সুইডেনের রিক্সডাগের অফিসিয়াল পেজ, উইকিপিডিয়ার নীতিগত সংক্ষিপ্ত বিবরণ এবং ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়ার ডাটাবেসে বিষয়টি স্পষ্ট। 


নরওয়েতে সেন্ট-লাগু পদ্ধতিতে সিট বণ্টন হয় এবং জাতীয় অনুপাতে কম পড়ে গেলে ‘লেভেলিং সিট’ যোগ করে ভারসাম্য আনা হয়। নরওয়ের সরকারি নির্বাচন সাইটে এবং সাম্প্রতিক তথ্যে, কবে নির্বাচন, কীভাবে হয় এবং পার্লামেন্টের গঠন- এসব নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়। 


আফ্রিকার দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৯৯৪ সাল থেকে জাতীয় ও প্রাদেশিক স্তরে লিস্ট পি আর চলছে। কনস্টিটিউশনাল সেটেলমেন্টের অংশ হিসেবে পি আর সেখানে ইনক্লুসিভিটি বা অন্তর্ভুক্তিকে প্রাধান্য দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের টেকনিক্যাল ব্রিফ, একাডেমিক বিশ্লেষণ এবং সাম্প্রতিক নির্বাচনের সংবাদ- সব মিলিয়ে বোঝা যায়, পি আর কাঠামো সেখানে বহুদলীয় প্রতিযোগিতা, ক্ষমতা ভাগাভাগি এবং প্রয়োজনীয় জোট রাজনীতির বাস্তবতা তৈরি করেছে। 


এখন প্রশ্ন, পি আর কেন কার্যকর। প্রথম যুক্তি, প্রতিটি ভোটের সমান মূল্যায়ন। ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্টে যে ভোটে প্রার্থী হারে, তা নীতিগতভাবে ‘নষ্ট’ হয়। পি আর এখানে ভোটকে দলীয় জমানো ব্যালট হিসেবে ধরে এবং শেষ পর্যন্ত আসনে রূপান্তর করে। এতে ‘ভোট-টু-সিট’ অনুপাতের বিকৃতি কমে এবং আস্থা বাড়ে। নিউজিল্যান্ড বা জার্মানির মডেলগুলোতে এই সমতা বজায় রাখার জন্য ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট সিট’ বা ‘ব্যালান্সিং’ ব্যবস্থাই মূল হাতিয়ার। 


দ্বিতীয় যুক্তি, ছোট দল ও ছড়িয়ে থাকা সমর্থনের প্রতিনিধিত্ব। বাংলাদেশের বাস্তবতায় অনেক মতবাদ, পেশাভিত্তিক স্বার্থগোষ্ঠী বা আঞ্চলিক ইস্যুভিত্তিক পার্টি কিছু জায়গায় ভোট পায়, কিন্তু একক আসনে জিততে না পারায় তারা সংসদে ঢুকতে পারে না। পি আর হলে তারা ভোটের অনুপাতে কণ্ঠ পায়। নেদারল্যান্ডস এই প্রতিনিধিত্বকে সর্বোচ্চে তুলেছে। সুইডেন ও নরওয়ে আবার ‘থ্রেশহোল্ড’ রেখে অতি খণ্ডিত দলপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করেছে। এই ভারসাম্যই আসলে পি আরের রাজনৈতিক কারিগরি। 


তৃতীয় যুক্তি, সমঝোতা ও মধ্যপন্থার সংস্কৃতি। পি আর সচরাচর একদলীয় অবারিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি করে না। ফলে সরকার গঠনে আলোচনার প্রয়োজন হয়। এটিকে অনেকে দুর্বলতা ভাবলেও রাজনৈতিক বিজ্ঞানী আরেন্ড লাইপহার্ট দেখিয়েছেন, ‘কনসেনসাস ডেমোক্রেসি’ দীর্ঘমেয়াদে অধিক অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং নীতিনির্ধারণে বেশি অংশগ্রহণমূলক হয়ে থাকে। তার ক্লাসিক ‘প্যাটার্নস অব ডেমোক্রেসি’ বইটি দেখায়, প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশনভিত্তিক ব্যবস্থা বহু মাত্রায় স্থিতিশীল এবং সংখ্যালঘু অধিকার সংরক্ষণে কার্যকর। 


চতুর্থ যুক্তি, নীতিগত ধারাবাহিকতা ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার। যখন ক্ষমতা একক কোনো দলের হাতে নয়, তখন নীতিনির্ধারণে বারবার আলোচনার টেবিলে ফিরতে হয় এবং হঠকারী উল্টাপাল্টা বাতিলের প্রবণতা কমে। সুইডেন, নরওয়ে, জার্মানি- এই দেশগুলোতে করনীতি, কল্যাণনীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যনীতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হওয়ার একটি কারণ হলো বহুদলীয় সংলাপের ধারাবাহিকতা। অফিসিয়াল নির্বাচনী কাঠামো ও সংসদীয় তথ্যগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে অনায়াসে দেখা যায় কিভাবে ‘লেভেলিং সিট’ এবং ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট সিট’ নীতিমালার ধারাবাহিকতাকে অনুপাতিক বৈধতা দেয়। 


পঞ্চম যুক্তি, ভোটার সন্তুষ্টি ও অংশগ্রহণ। তুলনামূলক গবেষণায় দেখা গেছে, যেখানে ভোটের মূল্য প্রায় সমানভাবে সিটে রূপ নেয়, সেখানে ভোটাররা ব্যবস্থাকে বেশি ন্যায্য মনে করে এবং অংশগ্রহণ টেকসই হয়। এই আলোচনায় ডেভিড ফ্যারেল প্রমুখের কাজ এবং বিভিন্ন সমীক্ষা উল্লেখযোগ্য, যদিও দেশে দেশে ফল ভিন্ন হতে পারে। 


ষষ্ঠ যুক্তি, বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও সামাজিক বৈচিত্র্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শহর-গ্রাম, কেন্দ্র-প্রান্ত, পেশা-শ্রেণি, তরুণ-প্রবীণ, বিভিন্ন রেখা আছে। ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্টে একটি এলাকায় ৪৯ শতাংশ ভোট পেয়ে কেউ হেরে গেলে সেই ভোটের কোনো প্রতিফলন থাকে না। পি আর এ জাতীয়ভাবে সেই ৪৯ শতাংশ মোট ভোটের অংশ হয়ে ওঠে এবং সংসদের ছবি রং বদলায়। জার্মান মডেলের মতো এমএমপি হলে আবার স্থানীয় প্রতিনিধিত্বও থাকে, পাশাপাশি সামগ্রিক অনুপাত ঠিক রাখতে ‘লিস্ট’ আসন দিয়ে ভারসাম্য আনা যায়। 


অবশ্য পি আর নিয়ে কিছু ন্যায্য শঙ্কাও উঠে আসে। প্রথমত, বহু ছোট দল সংসদে ঢুকে পড়লে স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হতে পারে। নেদারল্যান্ডসের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনায় দেখা গেছে, কোলিশন গঠন ও রক্ষণে সময় লাগে এবং কখনো কখনো জনগোষ্ঠীর সংখ্যালঘু অংশের পছন্দসই নীতিও জোটের সমঝোতায় সামনে চলে আসে। এটিকে অনেকে পি আরের ‘ডেমোক্রেটিক পিটফল’ হিসেবে দেখেন। তবে এই সমস্যার প্রযুক্তিগত সমাধান আছে। ন্যূনতম ভোটের থ্রেশহোল্ড, ‘লেভেলিং সিট’, বা প্রিফারেন্স ভোট, পার্টি ডিসিপ্লিন, ইত্যাদি মাধ্যমে খণ্ডীকরণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। 


দ্বিতীয়ত, সিদ্ধান্তে বিলম্ব হতে পারে। জোটের ভেতরে আলোচনা, পার্টনার বদল, নীতি আপস, সব মিলিয়ে দ্রুততার ঘাটতি দেখা দিতে পারে। কিন্তু এর পাল্টা যুক্তি হলো, দ্রুততার চেয়ে অন্তর্ভুক্তি এবং টেকসই সমঝোতা অনেক সময় বেশি মূল্যবান। লাইপহার্টের ‘কনসেনসাস’ মডেলে এই বিনিময়কে গণতান্ত্রিক পরিণতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। 


তৃতীয়ত, জনমতের প্রবল ঢেউ একবারে ক্ষমতার বড় পরিবর্তন ঘটাতে চাইলে পি আরে সেটি তুলনামূলকভাবে ‘গ্র্যাজুয়াল’ হয়। কেউ বলবেন এটিই স্থিতিশীলতা, আবার কেউ বলবেন এটি পরিবর্তনের গতি শ্লথ করে। দক্ষিণ আফ্রিকার সাম্প্রতিক নির্বাচনে শাসক দলের দীর্ঘদিনের ব্যবধান কমে জোটের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এটি দেখায় পি আরে জনমতের পরিবর্তনও স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়, যদিও একক দাপটের বদলে আলোচনার রাজনীতি সামনে আসে। 


বাংলাদেশের জন্য বাস্তবায়নের পথ কী। এক, সরাসরি লিস্ট পি আর। এতে সারাদেশকে বড় বড় বহুআসনীয় অঞ্চলে ভাগ করে প্রতিটি অঞ্চলে পার্টিলিস্ট ভোট নেওয়া যায় এবং শেষে জাতীয় বা আঞ্চলিক মোট ভোট ধরে সিট বণ্টন হয়। দুই, এমএমপি, নিউজিল্যান্ড-জার্মানির আদলে। এতে বিদ্যমান আসনগুলো স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে রয়ে যায়, তবে জাতীয় অনুপাত ঠিক রাখতে ‘লিস্ট সিট’ যোগ বা বিয়োগ করা হয়। তিন, মিশ্র সদস্য প্যারালাল। যেখানে লিস্ট সিট ও স্থানীয় সিট আলাদা ট্র্যাকে চলে, তবে এটি কঠোরভাবে অনুপাতিক নয়, ফলে ‘ভোট-টু-সিট’ বিকৃতি কিছুটা থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় এমএমপি বেশি প্রোপোরশনাল ফল নিশ্চিত করে, কারণ লিস্ট স্তরটি স্থানীয় স্তরের বিকৃতি সোজা করে দেয়। নিউজিল্যান্ড ও জার্মানির সরকারি ব্যাখ্যাগুলো পর্যালোচনা করলে পার্থক্য স্পষ্ট হয়। 


থ্রেশহোল্ডের প্রশ্নও জরুরি। সুইডেনে জাতীয় ৪ শতাংশ, নরওয়েতে ৪ শতাংশ, এ ধরনের একটি ন্যূনতম ভোটসীমা দিলে অতি ক্ষুদ্র দলগুলোর ‘ফ্র্যাগমেন্টেশন’ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, আবার রাজনৈতিক বৈচিত্র্যও থাকে। বাংলাদেশের আলোচনায় যদি অতি খণ্ডীকরণের শঙ্কা থাকে, থ্রেশহোল্ড ৩ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে রেখে পরীক্ষা করা যেতে পারে। তথ্যসূত্র অনুসারে সুইডেনের ৩৯টি অ্যাডজাস্টমেন্ট সিট এবং ৪ শতাংশ থ্রেশহোল্ড দীর্ঘদিন ধরেই অনুপাত ঠিক রাখা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ভারসাম্য হিসেবে কাজ করছে। 


আরেকটি সুবিধা হলো আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস। ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্টে একটি অঞ্চলে এক দল ৭০ শতাংশ ভোট পেলেও পাশের অঞ্চলে বারবার অল্প ব্যবধানে হারলে জাতীয় আসনে পিছিয়ে পড়ে। পি আরে সব ভোটই জাতীয় যোগফলের অংশ হয়ে ওঠে। নেদারল্যান্ডসের ‘ওয়ান ন্যাশনাল কনস্টিটুয়েন্সি’ ধারণা এই সমতার সর্বোচ্চ প্রকাশ, যদিও আমাদের মতো বড় ও জনবহুল দেশে বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে অঞ্চলভিত্তিক বহুআসনীয় এলাকায় ভাগ করাই যুক্তিযুক্ত। 


বাংলাদেশে পি আর নিয়ে অনেকেই ‘আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জোট রাজনীতি কি কার্যকর’? এই প্রশ্ন তোলেন। জবাব হতে পারে এই যে জোট সংস্কৃতি মানে শুধু মন্ত্রণালয় ভাগাভাগি নয়; এটি নীতিনির্ধারণে আলোচনার নতুন মানদণ্ড তৈরি করা। জার্মানিতে ‘কোয়ালিশন এগ্রিমেন্ট’ কয়েকশ পৃষ্ঠার হয় এবং তাতে কর, শিক্ষা, জ্বালানি, সামাজিক সুরক্ষা- সব বিষয়ে বহুস্তরীয় সমঝোতা লিপিবদ্ধ থাকে। এই চর্চা স্থিতিশীলতা দেয় এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে। জার্মান এমএমপি কাঠামোর মূল চেতনা, প্রার্থী ও পার্টি ভোটের ভারসাম্য। এই আলোচনার জায়গা তৈরি করে। 


এখন ‘সফলতার’ প্রশ্নে কয়েকটি দেশীয়-আন্তর্জাতিক মাপকাঠি ধরা যেতে পারে। এক, প্রতিনিধিত্বের ন্যায্যতা, ভোট-টু-সিট অনুপাত কতটা কাছাকাছি। দুই, নীতি ধারাবাহিকতা। নির্বাচনের পালাবদল সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার টিকে কি না। তিন, সংখ্যালঘু কণ্ঠের প্রতিফলন। মহিলা, সংখ্যালঘু, যুব কণ্ঠ সংসদে কতটা উপস্থিত। চার, সংঘাত ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক সংকটে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান কত দ্রুত হয়। লাইপহার্টের তুলনামূলক গবেষণা এবং বিভিন্ন সমীক্ষা ইঙ্গিত দেয়, কনসেনসাস ধরনের গণতন্ত্রে- যার কেন্দ্রে পি আর। এই সূচকগুলোর বেশ কয়েকটিতে তুলনামূলক ভালো ফল মেলে। অবশ্য সবকিছুই প্রাতিষ্ঠানিক নকশা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। 


অবশেষে আসি বাংলাদেশের বাস্তব করণীয় নিয়ে। প্রথম ধাপ হতে পারে একটি ‘হাইব্রিড’ ট্রায়াল। ধরা যাক, মোট আসনের একটি অংশ বর্তমান ব্যবস্থায় থাকবে, আর বাকি অংশ লিস্ট পি আর। কিন্তু এমএমপি নয়, বরং পরীক্ষামূলকভাবে ‘কমপেনসেটরি’ লিস্ট রাখা যায় যাতে জাতীয় অনুপাতে বড় বিকৃতি দূর হয়। এরপর নিরপেক্ষ মূল্যায়ন। ভোট-টু-সিট বিকৃতির হার, দলীয় বৈচিত্র্য, নীতি স্থিতিশীলতা। এই সূচকে দেখা যাবে পি আর কতটা কাজ করছে। পরবর্তী ধাপে প্রয়োজন হলে এমএমপি গ্রহণের পথে যাওয়া যায়। এই ধাপে ধাপে যাত্রা নিউজিল্যান্ডের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাযুজ্য রাখে, কারণ সেখানে ব্যাপক জনআলোচনা, কমিশনের সুপারিশ ও অবশেষে রেফারেন্ডামের মধ্য দিয়ে পরিবর্তন ঘটে।  


জনসচেতনতার দিকটিও জরুরি। পি আর মানে যেন ‘অন্তহীন ছোট ছোট দল’ এমন একটি ভীতি কাজ করে। অথচ সুইডেন-নরওয়ে দেখায়, যুক্তিসংগত থ্রেশহোল্ড, অ্যাডজাস্টমেন্ট সিট এবং সুষ্ঠু পার্টি ইনস্টিটিউশন থাকলে পি আর স্থিতিশীলতা নষ্ট করে না, বরং জনমতের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি বাড়ায়। সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সূত্রগুলো রিগসদাগ, নরওয়ের নির্বাচন দপ্তর, ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়া। এমন কাঠামোর সূক্ষ্ম নকশা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা দেয়। 


তথ্য-প্রমাণের সার কথা হলো, পি আর একক কোনো যাদুমন্ত্র নয়। প্রতিষ্ঠান ও নীতির গুণগত মানের সঙ্গে মিলে এটি কাজ করে। কিন্তু ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্টে যেভাবে ‘ভোটের অপচয়’ ও ‘আসনে বিকৃতি’ অনিবার্য হয়ে ওঠে, পি আর সেখানে সংশোধনের সুযোগ দেয়। নিউজিল্যান্ডে এমএমপি গ্রহণের পর সংসদে বৈচিত্র্য বেড়েছে এবং ছোট দলগুলোর নীতি প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে। জার্মানিতে এমএমপি বহুদলীয় কনসেনসাসকে স্থিতিশীল করেছে। নেদারল্যান্ডস সর্বোচ্চ অনুপাতিকতা দেখাচ্ছে, যদিও কোলিশন রাজনীতির জটিলতা আছে। কিন্তু সেটিকে ‘থ্রেশহোল্ড’ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়নে সামাল দেওয়া যায়। সুইডেন-নরওয়ে প্রমাণ করে, পি আর মানে কেবল খণ্ডীকরণ নয়, বরং কৌশলগত প্রাতিষ্ঠানিকতা। দক্ষিণ আফ্রিকা দেখায়, গভীর বিভাজনের পরও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিনিধিত্ব কীভাবে গণতান্ত্রিক ধারাকে এগিয়ে নিতে পারে। 


বাংলাদেশে গণতন্ত্রের শক্তি বাড়াতে হলে ন্যায্যতা, অন্তর্ভুক্তি এবং জনআস্থাই হবে মূল মানদণ্ড। পি আর এই তিনটিতে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে। এটি রাজনৈতিক মেরুকরণ কমাতে পারে, কারণ জোট-সংস্কৃতি বাধ্য করে কথা বলতে, শোনাতে এবং আপোসে পৌঁছাতে। এটি ভোটারকে আশ্বস্ত করে যে তার ভোট হারিয়ে যায় না, বরং সংসদের গঠনে হিসাবি অবদান রাখে। আর এটি সংসদকে দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক বৈচিত্র্যের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি করে। অবশ্যই এই পথে হাঁটতে হলে আইনি সংস্কার, নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, দলীয় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও থ্রেশহোল্ড-লেভেলিংয়ের মতো সূক্ষ্ম নকশা দরকার হবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলে, এই পরিশ্রম সার্থক। কারণ গণতন্ত্রের লক্ষ্য কেবল জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়, বরং জনগণের মতামতকে সত্যিকারভাবে ‘আকার’ দেওয়া। পি আর সেই আকারকে অনুপাতে আঁকে। যত ভোট, তত কণ্ঠস্বর, তত আসন।