ভাষা নির্বাচন / Select Language
  • 🇧🇩
    বাংলা মূল ভাষা (Original)
  • 🇺🇸
    English English
এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৯:২২ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

ট্রাম্পের ট্যারিফ-বিপ্লবে বড় ধাক্কা

ট্রাম্পের ট্যারিফ-বিপ্লবে বড় ধাক্কা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতির মূলে থাকা 'ট্যারিফ' বা আমদানিকৃত পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। এই রায়কে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ৯ জন বিচারপতির মধ্যে ৬ জনই এই শুল্কের বিপক্ষে রায় দিয়েছেন, যা ট্রাম্পের কয়েক মাসের পরিশ্রম, আন্তর্জাতিক সমঝোতা এবং হুঙ্কারকে এক নিমেষেই ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

রায়ের মূল প্রেক্ষাপট: আইন বনাম ক্ষমতা

গত বছরের এপ্রিলে ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকা অভিমুখে আসা প্রায় সমস্ত বিদেশি পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ বা তার বেশি হারে শুল্ক আরোপ করেন। তার যুক্তি ছিল, এর ফলে আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি (Trade Deficit) কমবে এবং বিদেশের কলকারখানাগুলো আবার আমেরিকায় ফিরে আসবে। কিন্তু এই শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে তিনি মার্কিন কংগ্রেস বা সংসদের অনুমোদন নেননি। পরিবর্তে, তিনি ১৯৭০-এর দশকের একটি পুরনো জরুরি আইন (Emergency Law) ব্যবহার করেছিলেন।

ব্যবসায়ী মহল এবং বেশ কিছু স্টেট এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে যায়। তাদের দাবি ছিল, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। সুপ্রিম কোর্ট আজ সেই দাবিতেই সিলমোহর দিল। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া এভাবে ঢালাও শুল্ক আরোপ করা অসাংবিধানিক।

ট্রাম্পের দাবির অসারতা: কী বলছে সরকারি পরিসংখ্যান?

গতকালই ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে দাবি করেছিলেন যে, ট্যারিফ আরোপের ফলে আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি ৭৮ শতাংশ কমেছে। কিন্তু সরকারি তথ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে।

১. বাণিজ্য ঘাটতির রেকর্ড:

২০২৫ সালের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আমেরিকার পণ্যের ঘাটতি ১.২৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এটি আগের বছরের তুলনায় ২ শতাংশ বেশি এবং ১৯৬০ সালের পর এটিই সর্বোচ্চ ঘাটতি। অর্থাৎ ট্রাম্পের শুল্ক নীতি ঘাটতি কমানোর বদলে বরং বাড়িয়েছে।

২. কর্মসংস্থান ও কারখানা:

ট্রাম্প দাবি করেছিলেন ট্যারিফ দিলে আমেরিকানদের চাকরি বাড়বে। অথচ গত এক বছরে আমেরিকার ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাতে প্রায় ৮০,০০০ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে অনেক কোম্পানি কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছে।

বিশ্লেষণ: আমদানির মানচিত্রে বড় পরিবর্তন

ট্রাম্পের শুল্ক নীতি আমেরিকার আমদানির ধরনে একটি বড় পরিবর্তন এনেছে, যা বৈশ্বিক রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:

চীনের সাথে ব্যবধান: চীনের সাথে আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে (২৯৫ বিলিয়ন থেকে ২০২ বিলিয়ন ডলার)।

ভারত ও ভিয়েতনামের উত্থান: চীনের ওপর কড়াকড়ি করায় আমেরিকার আমদানিকারকরা ভারত, ভিয়েতনাম এবং তাইওয়ানের দিকে ঝুঁকেছে। ভারতের সাথে আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি গত এক বছরে ২৮ শতাংশ বেড়েছে। তাইওয়ানের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার ৯৭ শতাংশ।

তিনটি অমীমাংসিত প্রশ্ন ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা

সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর তিনটি বড় প্রশ্ন এখন বিশ্ববাজারকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে:

টাকা ফেরত কি পাওয়া যাবে?

এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার শুল্ক হিসেবে আদায় করা হয়েছে। আমদানিকারকরা কি এই বিপুল পরিমাণ টাকা ফেরত পাবেন? সুপ্রিম কোর্ট এই বিষয়টি নিম্ন আদালতের ওপর ছেড়ে দিয়েছে, যার ফলে আইনি লড়াই আরও দীর্ঘ হতে পারে।

ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ কী?

হোয়াইট হাউস থেকে জানানো হয়েছে, তারা এই রায়ে সন্তুষ্ট নয় এবং ট্রাম্প একে 'লজ্জাজনক' বলে অভিহিত করেছেন। গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো অন্য কোনো আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে পুনরায় শুল্ক আরোপের চেষ্টা করবে।

বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ:

অনেক দেশ ট্যারিফ থেকে বাঁচতে আমেরিকার সাথে বিশেষ চুক্তি করেছিল। এখন যেহেতু ট্যারিফই অবৈধ ঘোষিত হয়েছে, তাই সেই দেশগুলো কি পুরনো চুক্তিতে বহাল থাকবে নাকি নতুন করে দর কষাকষি শুরু করবে?

অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি: সাধারণ জ্ঞান বনাম আবেগ

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাণিজ্য ঘাটতি মানেই কোনো দেশের ক্ষতি নয়। আমেরিকার শ্রমিকদের মজুরি চীনের তুলনায় প্রায় ৫ গুণ বেশি। তাই স্বাভাবিকভাবেই চীনে পণ্য উৎপাদন সস্তা। ট্রাম্প এই মৌলিক অর্থনীতিকে অগ্রাহ্য করে কেবল আবেগের ওপর ভিত্তি করে শুল্ক আরোপ করেছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত হিতে বিপরীত হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের এই রায় কেবল আমেরিকার জন্য নয়, বরং বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার (Global Trade System) জন্য একটি বড় জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া এবং তার প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপই বলে দেবে আমেরিকা কি আবার মুক্ত বাণিজ্যের পথে ফিরবে, নাকি নতুন কোনো আইনি যুদ্ধে জড়াবে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য এটি একটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। একদিকে আদালতের রায়, অন্যদিকে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি—এই দুইয়ের চাপে পড়ে আমেরিকার বাণিজ্য নীতি এখন এক গভীর গোলকধাঁধায়। সামনের দিনগুলোতে ওয়াল স্ট্রিট থেকে শুরু করে ভারতের দালান স্ট্রিট পর্যন্ত সবার নজর থাকবে ওয়াশিংটনের পরবর্তী মুভমেন্টের দিকে।