ভাষা নির্বাচন / Select Language
  • 🇧🇩
    বাংলা মূল ভাষা (Original)
  • 🇺🇸
    English English
ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ০৬ নভেম্বার ২০২৬, ০১:২৬ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

মজুরি ঘোষণা না আসায় পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত

আশুলিয়ায় শতাধিক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ

মজুরি ঘোষণা না আসায় পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত

ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি শ্রমিকদের। ডিসেম্বর থেকে নতুন বেতনকাঠামো চালুর বিষয়ে মজুরি বোর্ড একমত হলেও কত টাকা বাড়বে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং রপ্তানি চালান সময়মতো পাঠানো নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

মজুরি বাড়ানোর দাবিতে বৃহস্পতিবারও বিক্ষোভ করেছেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশ্রমিকেরা। ঢাকার উপকণ্ঠের আশুলিয়ায় শ্রমিকেরা কাজে যোগ দেওয়ার পর মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা চেয়ে কর্মস্থল ছেড়ে বেরিয়ে আসেন এবং একটি প্রধান সড়ক অবরোধ করেন। আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে শতাধিক কারখানার কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছে বলে শিল্প পুলিশ জানিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ ইট ছোড়েন এবং পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করেন। তবে বৃহস্পতিবারের পরিস্থিতি আশুলিয়াকেন্দ্রিক হলেও আগের দিনগুলোতে সাভার, গাজীপুর, মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্প এলাকাতেও বিক্ষোভ ও কারখানা বন্ধের খবর এসেছে।

শ্রমিকদের প্রধান দাবি, মাসিক ন্যূনতম মজুরি বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করা। তাঁদের বক্তব্য, খাদ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসার ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু মজুরি সেই অনুপাতে বাড়েনি। ৩০ হাজার টাকার দাবি বর্তমান ন্যূনতম মজুরির তুলনায় ১৭ হাজার ৫০০ টাকা বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি। শ্রমিকদের অনেকে বলছেন, দৈনন্দিন খরচ মেটাতে বর্তমান আয় যথেষ্ট হচ্ছে না।

রয়টারের প্রতিবেদনে একজন পোশাকশ্রমিকের বক্তব্যেও খাবার, বাসা ও যাতায়াত ব্যয়ের চাপের কথা এসেছে।

মজুরি নিয়ে অসন্তোষটি নতুন নয়। ২০২৩ সালের নভেম্বরে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছিল, যা কার্যকর হয় ওই বছরের ডিসেম্বর থেকে। শ্রমিকদের বর্তমান দাবি সেই কাঠামোর পরবর্তী বড় সংশোধন। মজুরি বোর্ড গঠনের আগেই বিক্ষোভ শুরু হওয়ায় বোর্ড গঠনের সময়, প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে বলে শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন।

সরকার গঠিত ছয় সদস্যের ন্যূনতম মজুরি বোর্ড ৪ নভেম্বর বৈঠকের পর ডিসেম্বর থেকে সংশোধিত বেতনকাঠামো চালুর বিষয়ে একমত হয়েছে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী প্রথম বেতন পাওয়ার কথা জানুয়ারিতে। কিন্তু বোর্ড মজুরি কত বাড়বে, কোন গ্রেডে কত নির্ধারিত হবে, কিংবা শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকার দাবির কতটা বিবেচনায় নেওয়া হবে, এসব বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। ফলে “ডিসেম্বর থেকে নতুন কাঠামো” চালুর ঘোষণা শ্রমিকদের কাছে তাৎক্ষণিক নিশ্চয়তা হয়ে ওঠেনি। Associated Press ও Reuters-এর এসোসিয়েট প্রেস ও রয়টারের প্রতিবেদনেও বোর্ডের সিদ্ধান্তের পরিমাণ এখনো অঘোষিত থাকার কথা বলা হয়েছে।

এখানেই বিক্ষোভের তাৎক্ষণিক কারণ ও গভীর সমস্যার মধ্যে পার্থক্যটি স্পষ্ট। মজুরি বোর্ড গঠিত হয়েছে এবং নতুন কাঠামো আসবে, এটি প্রক্রিয়াগত অগ্রগতি। কিন্তু শ্রমিকেরা জানতে চান, তাঁদের হাতে বাস্তবে কত টাকা আসবে এবং তা কবে থেকে কার্যকর হবে। বোর্ডের নির্দিষ্ট প্রস্তাব, সময়সূচি ও ব্যাখ্যা শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোর আগেই কাজে ফেরার আহ্বান জানানোয় ঘোষণার ওপর আস্থা তৈরি হয়নি। বুধবারের ঘোষণার পরও বহু শ্রমিক সিদ্ধান্তের অর্থ বুঝতে পারেননি বলে শ্রমিক নেতা কামরুল হাসানের বরাতে এএফপি জানিয়েছে।

বিক্ষোভের সময় সংঘর্ষ ও সম্পত্তি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। ২ নভেম্বরের প্রতিবেদনে ঢাকার মিরপুর, গাজীপুর ও সাভারের বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও কারখানা বন্ধের খবর প্রকাশিত হয়। পুলিশ বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। একই সময়ে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বিক্ষোভে রাজনৈতিক উসকানিদাতাদের অনুপ্রবেশের অভিযোগও তোলা হয়েছে। এসব অভিযোগ এবং শ্রমিকদের মজুরি ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত অভিযোগ আলাদা করে যাচাই করা জরুরি; কোনো পক্ষের দাবি এককভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত হবে না।

গ্রেপ্তার ও শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের আটক নিয়ে আরও যাচাইয়ের প্রয়োজন আছে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন IndustriALL বলেছে, বিক্ষোভের সময় অন্তত ১০ জন ট্রেড ইউনিয়ন নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং তাঁদের কেউ কেউ বিক্ষোভে জড়িত ছিলেন না বলে সংগঠনটি দাবি করেছে। অন্যদিকে সরকারি বক্তব্যে কিছু রাজনৈতিক কর্মীর বিক্ষোভে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ এসেছে। এসব দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয়, গ্রেপ্তারের কারণ এবং মামলার নথি স্বাধীনভাবে যাচাই না করে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।

কারখানা বন্ধের পরিসংখ্যানও সময় ও এলাকার ভিত্তিতে আলাদা করে দেখতে হবে। Reuters-এর বৃহস্পতিবারের খবরে আশুলিয়ায় শতাধিক কারখানা বন্ধের কথা বলা হয়েছে। এর আগে ২ নভেম্বর The Business Standard জানিয়েছিল, BGMEA ও BKMEA-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী সেদিন অন্তত ৬৯০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল এবং ১৭ লাখের বেশি শ্রমিক প্রভাবিত হয়েছিলেন। এই ৬৯০ সংখ্যাটি ৫ নভেম্বরের হিসাব নয়; তাই সেটিকে বর্তমান দিনের বন্ধ কারখানার সংখ্যা হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না।

এই অচলাবস্থার অর্থনৈতিক প্রভাব শ্রমিক ও মালিক, দুই পক্ষের ওপরই পড়তে পারে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত এবং দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি এই খাত থেকে আসে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। অর্ডার পূরণের সময়সূচি বিঘ্নিত হলে চালান দেরি, বাড়তি পরিবহন ব্যয় এবং ক্রেতাদের আস্থা কমার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন বন্ধ থাকলে শ্রমিকেরা মজুরি হারাতে পারেন, আর দীর্ঘ অনিশ্চয়তা কারখানার আর্থিক চাপ বাড়াতে পারে। মালিকপক্ষ উৎপাদন ও রপ্তানি সময়সূচি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তবে সেই উদ্বেগ শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও ন্যায্য মজুরির প্রশ্নকে অকার্যকর করে না।

এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য শুধু কাজে ফেরার আহ্বান যথেষ্ট হবে না। মজুরি বোর্ডকে নির্দিষ্ট প্রস্তাব, সিদ্ধান্তের সময়সীমা ও নতুন কাঠামো কার্যকর হওয়ার তারিখ স্পষ্ট করতে হবে। শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা এবং শ্রমিকদের কাছে সিদ্ধান্তের সহজ ব্যাখ্যা পৌঁছানোও জরুরি। একই সঙ্গে বিক্ষোভে সহিংসতা, ভাঙচুর, গ্রেপ্তার ও আহতের ঘটনা, প্রতিটি বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করতে হবে। প্রকাশের সময় আশুলিয়া ও অন্যান্য শিল্পাঞ্চলের কারখানা চালু বা বন্ধের সর্বশেষ অবস্থা এবং মজুরি বোর্ডের নতুন সিদ্ধান্ত আবার যাচাই করা উচিত।