ভাষা নির্বাচন / Select Language
  • 🇧🇩
    বাংলা মূল ভাষা (Original)
  • 🇺🇸
    English English
প্রকাশিত: ২৭ জুন ২০২৫, ০৩:৩৯ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

আত্মীয়তার বন্ধন : কুরআন-সুন্নাহ ও বিশ্বচিন্তায় এর গুরুত্ব

আত্মীয়তার বন্ধন : কুরআন-সুন্নাহ ও বিশ্বচিন্তায় এর গুরুত্ব

আত্মীয়তার বন্ধন মানুষের জীবনে এক মহৎ দায়িত্ব এবং সামাজিক বন্ধনের মূল ভিত্তি। কুরআন-সুন্নাহ এই সম্পর্ককে কেবল পারিবারিক দায় হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহান ইবাদতরূপে তুলে ধরেছে। সমাজবিজ্ঞান ও দার্শনিক চেতনায়ও আত্মীয়তার বন্ধন এক অপরিহার্য সামাজিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, ভোগবাদ এবং পারিবারিক অবক্ষয়ের যুগে এ সম্পর্কের গুরুত্ব নতুনভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন।

আল কুরআনের বহু আয়াতে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার প্রয়োজনীয়তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। সূরা আন-নিসার প্রথম আয়াতে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন- “আর আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে কিছু চাও এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করা থেকে বিরত থাকো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের উপর তত্ত্বাবধানকারী।” (সূরা আন-নিসা: ১)। এই আয়াতে আত্মীয়তার সম্পর্কের পবিত্রতা ও আল্লাহর কাছে এর গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে। এমনকি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার শাস্তির বর্ণনায় আল্লাহ বলেন- “তাদের কি আশা করা হয় যে, তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে? এরাই তারা, যাদেরকে আল্লাহ অভিশাপ দিয়েছেন, তাদের শ্রবণশক্তি ক্ষীণ করে দিয়েছেন এবং তাদের দৃষ্টিশক্তি অন্ধ করে দিয়েছেন।” (সূরা মুহাম্মদ: ২২-২৩)।

রাসূলুল্লাহ (সা.) আত্মীয়তার সম্পর্ককে ঈমানদারিত্বের পরিচয় হিসেবে দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন— “যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক বৃদ্ধি হোক এবং তার আয়ু বৃদ্ধি হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।” (সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম)। আর ভয়াবহ সতর্কবাণীতে তিনি উচ্চারণ করেছেন- “আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (সহিহ মুসলিম)। আরও এসেছে, আত্মীয়তার সম্পর্কের পবিত্রতা আরশের সাথেও যুক্ত- “আত্মীয়তার সম্পর্ক (রহম) আরশে ঝুলন্ত থাকে। সে বলে: যে আমাকে সংযোগ করবে, আল্লাহ তাকে সংযোগ করবেন, আর যে আমাকে ছিন্ন করবে, আল্লাহ তাকে ছিন্ন করবেন।” (সহিহ বুখারি)।

ইমাম নববীর ভাষায় আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার অর্থ কেবল অর্থ সাহায্য নয়; এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সদ্ব্যবহার, দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো, রোগ-শোকে সান্ত্বনা দেওয়া, এবং মন্দের প্রতিদান উত্তম আচরণে দেওয়া। ইবনু তাইমিয়া আত্মীয়তার বন্ধনকে ইসলামের সামাজিক ন্যায়বিচারের স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আর সমকালীন চিন্তাবিদ ড. ইউসুফ আল-কারজাভি আত্মীয়তার সম্পর্ককে সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং বলেছেন— “আত্মীয়তার সম্পর্ক পুনর্গঠন ছাড়া পরিবার ও সমাজের নৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় হতে পারে না।”

বিশ্বচিন্তায়ও আত্মীয়তার বন্ধন বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার। ইমিল দুর্খেইম লিখেছেন— “মানব সমাজের সংহতির শিকড় নিহিত থাকে আত্মীয়তার বন্ধনে। আত্মীয়তার শিকড় কেটে দিলে সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন হয় এবং নৈতিকতা লোপ পায়।” কনফুসিয়াস বলেছেন— “পরিবার হলো নৈতিক শিক্ষার প্রথম পাঠশালা। আত্মীয়তার সম্পর্ক বিনষ্ট হলে সমাজ দুর্বল হয়ে যায়।” মহাত্মা গান্ধী এ বন্ধনের শক্তিকে সমাজের প্রাণশক্তি হিসেবে দেখেছেন এবং বলেছেন— “পরিবার ও আত্মীয়তার বন্ধন হলো সমাজের মূল প্রাণ। আত্মীয়তার দায়িত্বকে অবহেলা মানে সমাজের ভিত্তি দুর্বল করা।”

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক সংহতির প্রধান ভিত্তি। পরিবার হলো সামাজিকীকরণের প্রথম প্রতিষ্ঠান। আত্মীয়তার বন্ধন নষ্ট হলে সমাজে একাকিত্ব, মানসিক অবক্ষয় ও অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

সুতরাং আত্মীয়তার বন্ধন কেবল পারিবারিক সম্পর্ক নয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আরোপিত এক পবিত্র দায়িত্ব, যা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের নৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় করে। আত্মীয়ের হক আদায় করা, দুঃসময়ে পাশে থাকা, সদ্ব্যবহার করা—সবই এর অংশ। যে আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখে, আল্লাহ তার জীবনকে সমৃদ্ধ করেন এবং যে তা ছিন্ন করে, সে আখিরাতে ভয়াবহ শাস্তির সম্মুখীন হয়। আজকের সমাজে এ বন্ধনকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করা এবং পুনরুজ্জীবিত করা প্রতিটি সচেতন মানুষের কর্তব্য।

উৎসসমূহ:

কুরআন মাজীদ: সূরা আন-নিসা: ১; সূরা মুহাম্মদ: ২২-২৩

সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, আল-আদাবুল মুফরাদ

ইমাম নববী: শারহ মুসলিম

ইবনু তাইমিয়া: মাজমু ফাতাওয়া

ড. ইউসুফ আল-কারজাভি: ফিকহুয-যাকাত

Emile Durkheim: The Division of Labour in Society

Confucius: Analects

Mahatma Gandhi: Collected Works of Mahatma Gandhi