ভাষা নির্বাচন / Select Language
  • 🇧🇩
    বাংলা মূল ভাষা (Original)
  • 🇺🇸
    English English
এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ২৩ জানুয়ারী ২০২৬, ০৫:২৩ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

আইস-এর গোপন পরোয়ানা বিতর্ক: মার্কিন শাসনতন্ত্রে নতুন অস্থিরতা

আইস-এর গোপন পরোয়ানা বিতর্ক: মার্কিন শাসনতন্ত্রে নতুন অস্থিরতা

মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইস-এর কর্মকর্তাদের জন্য তৈরি একটি নতুন নির্দেশিকা ঘিরে তোলপাড় শুরু হয়েছে গোটা যুক্তরাষ্ট্রে। হুইসেল-ব্লোয়ারদের একটি গোষ্ঠী বুধবার অভিযোগ করেছে যে, আইস এখন থেকে বিচারিক বা জুডিশিয়াল ওয়ারেন্ট ছাড়াই অভিবাসীদের বাড়িতে ঢুকে তাদের গ্রেফতার করার পরিকল্পনা করছে। হুইসেল-ব্লোয়ার এইড নামক ওই সংস্থাটি একটি গোপন মেমো প্রকাশ করেছে, যা গত ১২ মে স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে যে, এখন থেকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক পরোয়ানা বা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ওয়ারেন্টের ভিত্তিতেই কর্মকর্তাদের কারো ব্যক্তিগত বাসভবনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে।

প্রথাগতভাবে মার্কিন আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বাড়িতে প্রবেশ করতে হলে আদালতের অনুমোদিত বিচারিক পরোয়ানার প্রয়োজন হয়। কিন্তু আইস-এর ভারপ্রাপ্ত প্রধান টড লায়নসের স্বাক্ষরিত বলে দাবি করা এই নতুন মেমোতে বলা হয়েছে, সংবিধান বা বিদ্যমান ইমিগ্রেশন আইন কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক পরোয়ানা ব্যবহার করে কারো বাড়িতে ঢুকতে বাধা দেয় না। প্রশাসনিক পরোয়ানা মূলত কোনো ইমিগ্রেশন বিচারকের নির্বাসন আদেশের পর তৈরি করা হয়, যা সাধারণত বিচারিক আদালতের পরোয়ানার সমতুল্য নয়। বিচারিক পরোয়ানা মূলত কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এমন প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত প্রদান করে থাকে।

হুইসেল-ব্লোয়ার এইড তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, এই নতুন নীতি মার্কিন সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর সরাসরি লঙ্ঘন। এই সংশোধনী অনুযায়ী, কোনো নাগরিক বা ব্যক্তির ব্যক্তিগত পরিসরে অযৌক্তিক তল্লাশি বা দখলদারি চালানো নিষিদ্ধ। সংস্থাটির দাবি, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ বা ডিএইচএস আইনের কোনো পরিবর্তন না করেই হঠাৎ করে এমন বড় ধরণের নীতিগত পরিবর্তন আনতে পারে না। তাদের মতে, এটি আইনের শাসন এবং জনগণের মৌলিক অধিকারের ওপর চরম আঘাত।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, এই মেমোর সত্যতা তারা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। তবে হুইসেল-ব্লোয়ার হিসেবে পরিচিত দুই সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি বছরের শুরুর দিকে অন্তত এক বা দুটি স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে এই নীতি কার্যকর করা হয়েছিল। বিশেষ করে টেক্সাসের মতো রক্ষণশীল বিচারক অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এই ধরণের অভিযান শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। আইস-এর অনেক কর্মকর্তাকে মেমোটি পড়তে দেওয়া হলেও তাদের কাছে এর কপি রাখা বা বাইরে প্রকাশ করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। তারা কেবল সুপারভাইজারের উপস্থিতিতে এটি পড়ার সুযোগ পেয়েছেন।

এই খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর ডেমোক্র্যাট দলীয় সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের প্রধান ক্রিস্টি নোয়েমের কাছে এই গোপন নির্দেশিকার ব্যাখ্যা দাবি করেছেন। ব্লুমেনথাল বলেন, মার্কিন প্রশাসনের এমন গোপন নীতি সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করবে। কারো বাড়িতে জোর করে ঢুকে পড়া বা দরজা ভেঙে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া কেবল আইনগতভাবে ভুল নয়, বরং এটি নৈতিকভাবেও নিন্দনীয়। তিনি দ্রুত এই বিষয়ে শুনানি করার আহ্বান জানিয়েছেন।

অন্যদিকে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের মুখপাত্র ট্রিশা ম্যাকলাফলিন এই অভিযোগের সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিবাদ করেননি। তবে তিনি দাবি করেছেন যে, যেসব অভিবাসীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পরোয়ানা বা আই-২০৫ জারি করা হয়, তারা ইতিমধ্যেই আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত নির্বাসন আদেশ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, কয়েক দশক ধরে সুপ্রিম কোর্ট এবং কংগ্রেস অভিবাসন আইনের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক পরোয়ানার বৈধতা স্বীকার করে আসছে। আইস-এর কর্মকর্তাদের মতে, প্রশাসনিক পরোয়ানা ইস্যু করার ক্ষেত্রেও জোরালো যুক্তিসঙ্গত কারণ খতিয়ে দেখা হয়।

ঐতিহাসিকভাবে আইস কর্মকর্তারা সাধারণত মানুষের বাড়িতে ঢোকার জন্য বাসিন্দাদের স্বেচ্ছায় দরজা খোলার অপেক্ষায় থাকতেন অথবা প্রকাশ্য স্থানে গিয়ে সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার করতেন। কারণ বিচারিক পরোয়ানা ছাড়া ঘরে ঢোকা ছিল নিষিদ্ধ। অভিবাসন অধিকার কর্মীরাও সব সময় অভিবাসীদের পরামর্শ দিয়ে আসতেন যেন তারা কোনো বিচারিক পরোয়ানা ছাড়া আইস-এর জন্য দরজা না খোলেন। এমনকি ২০২৫ সালের একটি অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ম্যানুয়ালে আইস নিজেই স্বীকার করেছিল যে, পরোয়ানা ছাড়া বাড়িতে প্রবেশ সংবিধানের লঙ্ঘন।

কিন্তু মে মাসের এই নতুন নির্দেশিকায় আইস স্বীকার করেছে যে, এটি একটি নতুন এবং ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ। মেমোতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যদিও ঐতিহাসিকভাবে ডিএইচএস কেবল প্রশাসনিক পরোয়ানার ওপর ভিত্তি করে গ্রেফতার পরিচালনা করেনি, কিন্তু বর্তমানে তাদের আইনি উপদেষ্টারা মনে করছেন যে এটি করার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা নেই। মেমোতে আরও বলা হয়েছে, কর্মকর্তাদের প্রথমে দরজায় নক করতে হবে এবং নিজেদের পরিচয় দিতে হবে। কিন্তু যদি কেউ সাড়া না দেয়, তবে তারা যুক্তিসঙ্গত বল প্রয়োগ করে ঘরে ঢুকতে পারবেন। যদিও আই-২০৫ কোনো তল্লাশি পরোয়ানা নয়, তবুও একে গ্রেফতারের কাজে ব্যবহারের পূর্ণ অধিকার কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়েছে।

আইস-এর এই পদক্ষেপে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও। বিডেন প্রশাসনের সময় আইস-এর প্রধান আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কেরি ডয়েল বলেন, তিনি এই নতুন ব্যাখ্যা এবং সংবিধানের অপপ্রয়োগের সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করেন। তার মতে, গ্রেফতারের কোটা পূরণ করার তাড়নায় আইস এখন সাংবিধানিক শৃঙ্খলা ভেঙে ফেলার পথে হাঁটছে। এই বিতর্ক এখন কেবল আইনি গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি মার্কিন বিচার ব্যবস্থা এবং মৌলিক অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে এক নতুন মোড় নিয়েছে।

আইস-এর এই নীতিগত পরিবর্তন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আইনি কাঠামোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চতুর্থ সংশোধনীর মূল ভিত্তি হলো মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং ঘরবাড়ির গোপনীয়তা রক্ষা করা। প্রশাসনিক পরোয়ানা সাধারণত কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দ্বারা স্বাক্ষরিত হয়, যা বিচারিক নিরপেক্ষতার ঊর্ধ্বে নয়। যদি এই নীতি স্থায়ীভাবে কার্যকর হয়, তবে এটি নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতাকে অসীম করে তুলবে এবং বিচার বিভাগের তদারকিকে সংকুচিত করবে। এর ফলে কেবল অভিবাসী সমাজ নয়, বরং মার্কিন নাগরিকদের মৌলিক অধিকারও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে বল প্রয়োগ করে ঘরে প্রবেশের অনুমতি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ওপর জনগণের আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।