প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বার ২০২৬ , ০৬:১৫ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
সরকারের প্রতি জনগণের তৈরি হওয়া অনাস্থা ও বিভিন্ন সংকট থেকে দৃষ্টি সরাতে দেশজুড়ে পরিকল্পিতভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার।
সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক জরুরি ব্রিফিংয়ে তিনি এ অভিযোগ করেন। একই ধরনের বক্তব্য নিয়ে সোমবার রাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের সাত মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজ উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, এ পরিস্থিতিতে জনগণ ধীরে ধীরে সরকারের ওপর আস্থা হারাচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর মহানগর থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামপর্যায়ে দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এর ফলে বিভিন্ন স্থানে সংঘাত, সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খলা বাড়ছে বলে দাবি করেন তিনি।
গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে জামায়াতের এই নেতা বলেন, সার ডিলার নিয়োগ, ইমাম-খতিবদের ভাতা, কৃষক ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, তালিকা প্রণয়ন ও তদারকিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। এমনকি সার বিতরণকে কেন্দ্র করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে হামলার ঘটনাও ঘটছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন গোলাম পরওয়ার। তার অভিযোগ, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ভেরিফিকেশনের নামে এক শ্রেণির প্রার্থীর নিয়োগ আটকে দেওয়া হচ্ছে এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বাছাই করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, এর ফলে নিয়োগবঞ্চিত শিক্ষিত নারী-পুরুষরা রাজধানীর শাহবাগে আন্দোলন করছেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ব্রিফিংয়ে পাওয়া যায়নি।
সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ওপর সংরক্ষিত নারী এমপিদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে এবং উন্নয়ন বরাদ্দের ক্ষেত্রেও নির্বাচিত এমপিদের পরিবর্তে সংরক্ষিত নারী এমপিদের ডিও লেটার ব্যবহার করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলা-ভাঙচুরের ঘটনাও ব্রিফিংয়ে তুলে ধরেন তিনি। এর মধ্যে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট এবং ইসিবি এলাকায় কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনা উল্লেখ করেন। এসব ঘটনার পর বিভিন্ন পক্ষ থেকে তদন্ত ও জড়িতদের বিচারের দাবি উঠেছে।
গোলাম পরওয়ারের অভিযোগ, এসব অপরাধের পেছনে সরকারদলীয় নেতা-কর্মী ও মন্ত্রীদের একটি অংশের মদদ রয়েছে। সরকারের ওপরের স্তর থেকে সংকেত পাওয়ার কারণেই সন্ত্রাসীরা সুযোগ পাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে সরকার নিজেদের দলের লোকজনের অপরাধ আড়াল করে বিরোধী দলের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, রাজধানীতে মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা না থাকলে একই পরিস্থিতি সারাদেশেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দ্রব্যমূল্য, সার, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করার কারণে জনগণের মধ্যে যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে, তা আড়াল করতেই দেশের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তার অভিযোগ, ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবিত কাঠামো বাদ দিয়ে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার না করে সরকার দেশকে নতুন সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণের মতামত উপেক্ষা করে কোনো সরকার দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। দাবি আদায়ে জামায়াতে ইসলামীর কর্মসূচি সংসদের ভেতরে ও বাইরে অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে সরকারের গণবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
ব্রিফিংয়ে সাম্প্রতিক হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানানো হয়। জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ ছাড়া মিরপুরের স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে লুট হওয়া টিকা, টিকাদান-সংক্রান্ত রেজিস্টার ও নথি উদ্ধারের দাবি জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে বিকল্প স্থানে দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম চালু, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা পুনর্নির্মাণ ও ক্ষতিপূরণ এবং জমি দখলের যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করার দাবিও জানায় দলটি।
ঘটনার সময় স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন গোলাম পরওয়ার।