কাজী শামসুল হক

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বার ২০২৬ , ০৪:৫৬ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

শিশুশিক্ষায় এআই, নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে শেখার পথও খুলতে হবে

নিউইয়র্ক সিটির সরকারি স্কুলে প্রাকপ্রাথমিক পর্যায় থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার্থীমুখী জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে এক বছরের স্থগিতাদেশ শুরু হয়েছে। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষজুড়ে এই নীতি কার্যকর থাকবে। উচ্চবিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর জন্য বছরে দুবার এআই সাক্ষরতার পাঠ থাকবে এবং নির্বাচিত শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে সীমিত পরীক্ষামূলক ব্যবহার চলবে। সব শ্রেণিতে কৃত্রিম সঙ্গী বা কম্প্যানিয়ন চ্যাটবট নিষিদ্ধ থাকবে। অতএব এটি প্রযুক্তিকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান না করে শিশু কোন বয়সে, কী উদ্দেশ্যে এবং কতটা নিরাপদ পরিবেশে এআই ব্যবহার করবে, সেই প্রশ্নের একটি সতর্ক প্রাতিষ্ঠানিক উত্তর।

সিদ্ধান্তটির পেছনে যুক্তি আছে। শিশুর শেখার প্রথম স্তরে নিজের ভাষায় চিন্তা করা, ভুল করা, আবার চেষ্টা করা, হাতে লেখা, পড়ে বোঝা, প্রশ্ন তৈরি করা এবং সহপাঠীর সঙ্গে আলোচনা করার অভ্যাস গড়ে ওঠে। জেনারেটিভ এআই যদি অনায়াসে উত্তর, সারাংশ, রচনা বা সমাধান বানিয়ে দেয়, তবে শিক্ষার্থী কাজ জমা দিতে পারলেও তার চিন্তার পেশি শক্তিশালী নাও হতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর শর্টকাট ধীরে ধীরে কৌতূহল, ধৈর্য, স্মৃতিচর্চা ও স্বাধীন বিচারশক্তিকে দুর্বল করতে পারে। ভুল তথ্য, গোপনীয়তার ঝুঁকি, অজানা পক্ষপাত এবং পরীক্ষায় অসততার আশঙ্কাও উপেক্ষা করা যায় না।

তবে শুধু স্কুলের নেটওয়ার্কে এআই বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। শিশুরা বাড়ির ফোন, ব্যক্তিগত কম্পিউটার কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে পারে। সচ্ছল ও প্রযুক্তিসচেতন পরিবারে তারা নির্দেশনা পাবে, অন্য পরিবারে পাবে না। ফলে নিষেধাজ্ঞা অনিচ্ছাকৃতভাবে নতুন ডিজিটাল বৈষম্যও তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে অভিবাসী পরিবারে ভাষাগত বাধা থাকলে অভিভাবকদের কাছে নীতির উদ্দেশ্য, সীমা এবং ঘরে করণীয় স্পষ্টভাবে পৌঁছানো জরুরি। বাংলা ভাষাসহ বহুভাষিক নির্দেশিকা, অভিভাবক কর্মশালা এবং শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ছাড়া নীতির সুফল অসমভাবে বণ্টিত হবে।

বাংলাদেশি অভিভাবকদেরও একটি ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে। সন্তানকে শুধু নিষেধ করলে সে গোপনে ব্যবহার করতে পারে। বরং তাকে বোঝাতে হবে, কোন কাজে এআই গ্রহণযোগ্য এবং কোন কাজে নিজের চিন্তা অপরিহার্য। বাড়ির কাজের উত্তর তৈরি না করিয়ে কঠিন ধারণা ব্যাখ্যা, অনুশীলনের প্রশ্ন বানানো বা নিজের লেখা যাচাইয়ের মতো সহায়ক ব্যবহার পরবর্তী পর্যায়ে শেখানো যেতে পারে। তবে শিশুর নাম, ছবি, স্কুল, স্বাস্থ্য বা পারিবারিক তথ্য কোনো চ্যাটবটে দেওয়া যাবে না। প্রতিদিন কিছু সময় বই পড়া, হাতে লেখা ও মুখোমুখি আলাপের জন্য নির্ধারিত রাখাও পরিবারের দায়িত্ব।

সিটির পরিকল্পনায় তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির জন্য দৈনিক ৩০ মিনিট এবং ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির জন্য ৪৫ মিনিট স্কুলভিত্তিক স্ক্রিন ব্যবহারের সুপারিশও রয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সমস্যাটি শুধু এআই নয়। অতিরিক্ত স্ক্রিন শিশুর মনোযোগ, ঘুম, শরীরচর্চা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সরাসরি সামাজিক যোগাযোগের সময় সংকুচিত করে। একই সঙ্গে শিক্ষা বিভাগ অপ্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সরঞ্জাম বাদ দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত সব ডিজিটাল পণ্য পর্যালোচনা করবে। এই পর্যালোচনায় শিক্ষাগত উপকার, শিশু সুরক্ষা, তথ্য সংগ্রহ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য এবং মানবিক যোগাযোগের ওপর প্রভাব, সবকিছুর প্রকাশ্য মানদণ্ড থাকা উচিত।

অন্যদিকে, এআই ভবিষ্যতের শিক্ষা ও কর্মজগতের বাস্তবতা। শিশুদের দীর্ঘদিন অজ্ঞ রেখে দেওয়াও সমাধান নয়। বয়সোপযোগী এআই সাক্ষরতা মানে কেবল সফটওয়্যার চালানো শেখানো নয়। কোন উত্তর বিশ্বাসযোগ্য, কোথায় সূত্র চাইতে হবে, কীভাবে পক্ষপাত শনাক্ত করতে হয়, ব্যক্তিগত তথ্য কেন দেওয়া যাবে না এবং যন্ত্রের সাহায্য নেওয়া ও নিজের কাজের সীমারেখা কোথায়, এসব শেখানোই প্রকৃত প্রস্তুতি। উচ্চবিদ্যালয়ের পরীক্ষামূলক কর্মসূচিতে তাই ফলাফলের পাশাপাশি শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তি, লেখার মান, সততা, নিরাপত্তা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের প্রভাব স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করা দরকার।

এই এক বছরকে বিরতি হিসেবে নয়, প্রমাণ সংগ্রহ ও নীতি নির্মাণের সময় হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। শিক্ষক, অভিভাবক, শিশু বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তিবিদ এবং শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্দিষ্ট সময় অন্তর অগ্রগতি প্রকাশ করা উচিত। কোন সরঞ্জাম নিরাপদ, কোন বয়সে কোন ব্যবহার গ্রহণযোগ্য এবং কী ধরনের মানব তত্ত্বাবধান বাধ্যতামূলক হবে, তার স্পষ্ট কাঠামো তৈরি করতে হবে।

নিউইয়র্কের পদক্ষেপের মূল শিক্ষা হলো, প্রযুক্তি যেন শিক্ষার সহায়ক হয়, বিকল্প শিক্ষক বা বিকল্প মেধা নয়। শিশুকে যন্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করা লক্ষ্য হতে পারে না। লক্ষ্য হওয়া উচিত তাকে এমন মানুষ করে তোলা, যে নিজের বিবেক, বুদ্ধি ও সৃজনশীলতা দিয়ে যন্ত্রকে পরিচালনা করবে। নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সেই যোগ্যতা তৈরির পথ খুলতে পারলেই এ উদ্যোগ অনুকরণীয় হয়ে উঠবে।