খেলাধুলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০২৬ , ০৬:৪১ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

ভাগ্যের কাছে পরাজিত দিদিয়ের দেশম

ফুটবলের মঞ্চে দিদিয়ের দেশমের গল্পটা শুধু সাফল্যের নয়, অপূর্ণতারও। খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ জিতেছেন, কোচ হিসেবেও ফ্রান্সকে শিরোপার স্বাদ দিয়েছেন। কিন্তু ১৪ বছরের দীর্ঘ অধ্যায়ের শেষটা তিনি লিখতে চেয়েছিলেন আরও একবার বিশ্বকাপ জিতে। সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না। স্পেনের কাছে সেমিফাইনালে হেরে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেই শেষ হচ্ছে দেশমের ফ্রান্স অধ্যায়।

বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই শিরোপার অন্যতম দাবিদার ছিল ফ্রান্স। কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসেদের নিয়ে গড়া দলটি গ্রুপ পর্ব থেকে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণও দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ফরাসিদের রিজার্ভ বেঞ্চও অনেক দেশের প্রথম একাদশের চেয়ে শক্তিশালী। ফলে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখাটা অস্বাভাবিক ছিল না।

তবে সেমিফাইনালের রাতে সব হিসাব পাল্টে দেয় স্পেন। শিরোপার পথে দুর্দান্ত ছুটে চলা ফ্রান্সকে থামিয়ে দেয় তারা। সেই সঙ্গে বিশ্বকাপ জিতে বিদায় নেওয়ার দেশমের স্বপ্নটাও ভেঙে যায়।

এখন ফ্রান্সের সামনে বাকি আছে শুধু তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ। অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পের কাছে সেটি কেবল আরেকটি ম্যাচ নয়, বরং প্রিয় কোচকে সম্মান জানানোর উপলক্ষ। তাঁর ভাষায়, "তাঁর জন্য এখনও একটি ম্যাচ বাকি আছে। আমাদের নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিতে হবে। তিনি এবং সমর্থকেরা সেটির যোগ্য। আমরা বিশ্বকাপটা তৃতীয় স্থান নিয়ে শেষ করতে চাই।"

১৯৯৮ সালে খেলোয়াড় হিসেবে ফ্রান্সকে প্রথম বিশ্বকাপ জেতানোর অধিনায়ক ছিলেন দেশম। দুই দশক পর ২০১৮ সালে কোচ হিসেবে এনে দেন দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। ২০২২ সালে দলকে নিয়ে যান ফাইনালে, যেখানে তারা রানার্সআপ হয়। উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপ দিয়ে নিজের বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের ইতি টানতে চেয়েছিলেন আরেকটি শিরোপা দিয়ে। কিন্তু ফুটবল সব সময় রূপকথার সমাপ্তি লেখে না।

সেমিফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে কিছু সিদ্ধান্তও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দ্বিতীয়ার্ধে মাইকেল ওলিসেকে তুলে নেওয়ার পর ফরাসি আক্রমণভাগ অনেকটাই নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে। রিজার্ভ বেঞ্চের খেলোয়াড়দের ব্যবহার এবং মাঠে খেলোয়াড়দের যথাযথ নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রেও সমালোচনার মুখে পড়েছেন দেশম। ফেভারিটের চাপও হয়তো প্রভাব ফেলেছিল ফরাসি শিবিরে।

তবু একটি ম্যাচ দিয়ে দেশমের ১৪ বছরের অবদানকে বিচার করা কঠিন। ২০১২ সালে ফ্রান্সের দায়িত্ব নেওয়ার পর দলকে দুটি বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলেছেন তিনি। একবার হয়েছেন চ্যাম্পিয়ন, একবার রানার্সআপ। বিশ্বকাপে ফ্রান্সের ডাগআউটে ২৬ ম্যাচ পরিচালনা করে গড়েছেন অনন্য এক রেকর্ডও।

গত বছরের জানুয়ারিতেই দেশম ঘোষণা দিয়েছিলেন, বিশ্বকাপ শেষে জাতীয় দলের দায়িত্ব ছাড়বেন তিনি। সেমিফাইনাল শেষে সংবাদ সম্মেলনে ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, "ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলার সময় এখন নয়। আমি সেমিফাইনালে বা ফাইনালে কোনো প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নিচ্ছি কি না, ব্যক্তিগতভাবে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়।"

নিজের কোচিং অধ্যায় নিয়ে অবশ্য গর্বিত তিনি। দেশম বলেন, "আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে এই পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছি। বিশ্বকাপ জিততে পেরেছি। ফরাসি দলকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে যা কিছু করেছি, তার জন্য আমি গর্বিত।"

খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে দুই জীবনের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে তিনি আরও বলেন, "খেলোয়াড় হিসেবে আমি ভাগ্যবান ছিলাম। অনেক সুখের মুহূর্ত উপভোগ করেছি। আজকের মুহূর্তটি অবশ্য তেমন নয়।"

দেশমের বিদায় নিয়ে আক্ষেপ রয়েছে তাঁর সাবেক শিষ্যদেরও। ফ্রান্সের সাবেক স্ট্রাইকার অলিভিয়ে জিরু মনে করেন, দেশমের প্রাপ্য ছিল রাজকীয় বিদায়। তিনি বলেন, "দিদিয়েরকে তাঁর প্রাপ্য সমাপ্তিটা দেওয়ার জন্য খেলোয়াড়দের মধ্যে বাড়তি প্রেরণা ছিল। তিনি সেটা পাননি। কিন্তু ১৪ বছরে যা করেছেন, তাতেই তিনি একজন কিংবদন্তি। তাঁর হয়ে কথা বলবে তাঁর রেকর্ড।"

ফুটবলের ইতিহাসে সব গল্পের শেষটা শিরোপা দিয়ে লেখা হয় না। কিছু গল্প অপূর্ণতার মধ্যেও পূর্ণ হয়ে ওঠে। দিদিয়ের দেশমের বিদায়ও তেমনই। ভাগ্যের কাছে হার মানলেও, ফরাসি ফুটবলের ইতিহাসে তিনি থেকে যাবেন সাফল্য, নেতৃত্ব আর কিংবদন্তির এক উজ্জ্বল নাম।