প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০২৬ , ১১:৫৩ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে ইসরায়েলকে দেওয়া বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছেন ১০০ জনের বেশি ডেমোক্র্যাট সদস্য। যদিও সংশোধনীটি শেষ পর্যন্ত পাস হয়নি, তবুও এই ভোটাভুটি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরে ইসরায়েলকে ঘিরে অবস্থানগত পরিবর্তন এবং ক্রমবর্ধমান মতপার্থক্যকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। খবর বিবিসির।
স্থানীয় সময় বুধবার রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান থমাস ম্যাসি উত্থাপিত সংশোধনীর পক্ষে ভোট দেন ১০৩ জন ডেমোক্র্যাট সদস্য এবং একজন রিপাবলিকান সদস্য। বিপক্ষে ভোট পড়ে ৩১৪টি। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ৯৮ জন সদস্য সংশোধনীর বিরোধিতা করেন এবং আরও ১০ জন সদস্য 'প্রেজেন্ট' ভোট দেন, অর্থাৎ তাঁরা পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো অবস্থান নেননি।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের সমালোচক থমাস ম্যাসি দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সামরিক সমর্থনের সমালোচনা করে আসছেন। তাঁর উত্থাপিত এই সংশোধনীকে অনেকেই ইসরায়েল প্রশ্নে মার্কিন রাজনীতির নতুন বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
এ ভোটাভুটিতে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যেও মতপার্থক্য দেখা গেছে। হাউস মাইনরিটি লিডার হাকিম জেফরিজ এবং হাউস ডেমোক্র্যাটিক ককাসের চেয়ারম্যান পিট আগুইলার সংশোধনীর বিপক্ষে ভোট দেন। অন্যদিকে, হাউস ডেমোক্র্যাটিক হুইপ ক্যাথরিন ক্লার্ক এর পক্ষে ভোট দেন।
প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের দাবি, এই প্রথমবারের মতো প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ডেমোক্র্যাট সদস্য ইসরায়েলকে বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। দুই বছর আগে একই ধরনের একটি ভোটাভুটিতে মাত্র ৩৭ জন ডেমোক্র্যাট সদস্য এ ধরনের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।
ভোটের পর কংগ্রেশনাল প্রগ্রেসিভ ককাসের চেয়ারম্যান গ্রেগ ক্যাসার বলেন, "আজ সংখ্যাগরিষ্ঠ ডেমোক্র্যাট সদস্য ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র পাঠানোর পক্ষে ভোট দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।" তাঁর ভাষায়, এই ভোট ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করছে যে, তাঁর যুদ্ধ এবং কথিত যুদ্ধাপরাধের জন্য জবাবদিহিহীন সমর্থন দেওয়ার দিন শেষের দিকে।
ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ইলহান ওমর বলেন, প্রতিনিধি পরিষদে এমন একটি ভোট অনুষ্ঠিত হবে, তা তিনি এবং কংগ্রেসের একমাত্র ফিলিস্তিনি-আমেরিকান সদস্য রাশিদা তালিব কয়েক বছর আগেও কল্পনা করতে পারেননি। তাঁর মতে, এটি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অবস্থান পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
তবে ভোটের আগে ডেমোক্র্যাটিক নেতৃত্ব এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক 'হুইপ' জারি করেনি। হাকিম জেফরিজ সদস্যদের নিজ নিজ বিবেক অনুযায়ী ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দলটির সদস্যরা একাধিক বৈঠকে ভোটাভুটির সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন বলেও জানা গেছে।
যদিও ক্যাথরিন ক্লার্ক সংশোধনীর পক্ষে ভোট দিয়েছেন, তিনি এর কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, প্রস্তাবটি শুধু সামরিক সহায়তাই নয়, গাজায় ফিলিস্তিনি শরণার্থী ও বেসামরিক মানুষের জন্য বরাদ্দ মানবিক সহায়তার অর্থায়নও বন্ধ করে দিতে পারত। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি কোনোভাবেই টেকসই নয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের আইন, স্বার্থ ও মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকলে কোনো দেশকেই সীমাহীন ও জবাবদিহিহীন সামরিক সহায়তা দেওয়া উচিত নয়।
অন্যদিকে, সংশোধনীর বিপক্ষে ভোট দেওয়া ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি মার্ক পোকান মনে করেন, প্রস্তাবটি কখনোই পাস হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। তবে তিনি সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য দলীয় নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
'প্রেজেন্ট' ভোট দেওয়া প্রতিনিধি জ্যারেড হাফম্যান বলেন, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অধিকাংশ সদস্যের মধ্যেই ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মার্কিন নীতিতে পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, থমাস ম্যাসির সংশোধনী সেই বার্তা তুলে ধরার একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংশোধনীটি পাস না হলেও এই ভোটাভুটি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরে ইসরায়েল প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধের পর ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন নিয়ে দলটির প্রগতিশীল অংশের চাপ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।