ভাষা নির্বাচন / Select Language
  • 🇧🇩
    বাংলা মূল ভাষা (Original)
  • 🇺🇸
    English English
ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৭ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশে শ্রমবাজারে অদক্ষতায় পিছিয়ে তরুণরা

বাংলাদেশে শ্রমবাজারে অদক্ষতায় পিছিয়ে তরুণরা

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ যুব জনসংখ্যার দেশের একটি। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৪ কোটি ৭৫ লাখ মানুষের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। এই বিপুল যুব জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জনমিতিক লভ্যাংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু দক্ষতার ঘাটতি, শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে অমিল এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতার কারণে সেই সম্ভাবনা এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

আজ বুধবার বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস উপলক্ষে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০১৪ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ দিবসটি ঘোষণা করে এবং ২০১৫ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী এটি পালিত হচ্ছে। প্রযুক্তিগত ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং কর্মসংস্থানের উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরাই দিবসটির মূল উদ্দেশ্য। এ উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দেশজুড়ে শোভাযাত্রা, সেমিনার ও দক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে।

তবে বাংলাদেশের জন্য দিবসটির তাৎপর্য কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়। দেশের শ্রমবাজারের বাস্তবতা বলছে, বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করেও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন না। অন্যদিকে শিল্প খাত প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী না পেয়ে সংকটে রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩ অনুযায়ী, দেশে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী শ্রমশক্তির সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৬৮ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ১৯ লাখ ৪০ হাজার তরুণ বেকার, যা এই বয়সসীমার শ্রমশক্তির ৭ দশমিক ২ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশের মোট বেকার জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭৯ শতাংশই এই তরুণ বয়সসীমার অন্তর্ভুক্ত।

সরকারের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) ‘হারনেসিং দ্য পটেনশিয়ালস অব ইয়ুথ’ শীর্ষক নীতিপত্র অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় ৫৫ লাখ তরুণ-তরুণী বর্তমানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা কোনো ধরনের প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নন। একই প্রতিবেদনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্নকারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের অন্যতম কারণ হলো ‘স্কিলস মিসম্যাচ’ বা দক্ষতা ও চাহিদার অমিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত প্রথাগত শিক্ষার সঙ্গে শিল্প ও সেবা খাতের বাস্তব প্রয়োজনীয়তার বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ফলে একদিকে শিক্ষিত তরুণরা চাকরি পাচ্ছেন না, অন্যদিকে উৎপাদন ও শিল্প খাত দক্ষ জনবলের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয়করণ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষেত্রের ধরন বদলে দিচ্ছে। বর্তমানে নিয়োগের ক্ষেত্রে কেবল একাডেমিক সনদ নয়, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, ডিজিটাল সক্ষমতা, ভাষাজ্ঞান, যোগাযোগ দক্ষতা এবং জটিল সমস্যা সমাধানের সামর্থ্যকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশ সরকার দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করছে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি, তৈরি পোশাক, নির্মাণ, ইলেকট্রিক্যাল, অটোমোবাইল, কৃষি ও পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সরকারের সবচেয়ে বড় দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামের (এসইআইপি) আওতায় এখন পর্যন্ত প্রায় আট লাখ মানুষকে ১৩০টিরও বেশি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

তবে এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও দক্ষ জনবলের ঘাটতি পুরোপুরি কাটেনি। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণায় দেখা গেছে, তৈরি পোশাক, তথ্যপ্রযুক্তি, নির্মাণ, হালকা প্রকৌশল এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পে এখনও দক্ষ কর্মীর উল্লেখযোগ্য সংকট রয়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিধারী অনেক তরুণকে নিয়োগের পর নতুন করে প্রশিক্ষণ দিতে হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় ও সময় দুটিই বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক শ্রমবাজারে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, বিদেশগামী বাংলাদেশি কর্মীদের সিংহভাগই অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ শ্রমিক। তারা মূলত নির্মাণ, কৃষি, পরিচ্ছন্নতা কিংবা সাধারণ শ্রমভিত্তিক কম বেতনের কাজে নিয়োজিত হচ্ছেন।

অন্যদিকে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, ইতালি এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ওয়েল্ডার, ইলেকট্রিশিয়ান, মেশিন অপারেটর, কেয়ারগিভার, স্বাস্থ্যকর্মী ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের দক্ষ কর্মীদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান এবং বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত সনদের ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ এখনও এই উচ্চ আয়ের শ্রমবাজারে প্রত্যাশিত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, এ কারণেই ফিলিপাইন, ভারত কিংবা ভিয়েতনামের কর্মীদের তুলনায় বাংলাদেশি কর্মীদের গড় আয় কম এবং একই সংখ্যক কর্মী বিদেশে গেলেও দেশ তুলনামূলক কম রেমিট্যান্স অর্জন করছে।

বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবসের প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিপুল যুব জনগোষ্ঠীকে জনমিতিক সুবিধা থেকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা। আর সেটি নির্ভর করবে দক্ষতা উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি শিক্ষা এবং ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকর সংযোগ তৈরির ওপর।