ঢাকা অফিস

প্রকাশিত: ২১ জুলাই ২০২৬ , ০১:৫৩ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

টেকসই এলডিসি উত্তরণে তিন বছর সময় চায় বাংলাদেশ

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে টেকসই ও সুশৃঙ্খল উত্তরণ নিশ্চিত করতে প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন চাইছে বাংলাদেশ। সরকারের মতে, এই অতিরিক্ত সময় দেশের অর্থনৈতিক সংস্কারকে আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করবে এবং এলডিসি-পরবর্তী বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়ক হবে।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) বৈঠকে বাংলাদেশের আবেদন পর্যালোচনা করা হবে। ইকোসকের সুপারিশের ভিত্তিতে আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ সরকার গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণের আবেদন জানায়। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদারে সরকার কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। গত ৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বাংলাদেশের অনুরোধের প্রতি ব্যক্তিগত সহযোগিতা কামনা করেন।

গত জুনে সিডিপি বাংলাদেশের আবেদনকে নীতিগতভাবে সমর্থন জানালেও সময় বৃদ্ধির বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সুপারিশ করেনি। ফলে বিষয়টি এখন ইকোসকের বিবেচনার জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি ইকোসকের সভাপতি ও নেপালের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত লোক বাহাদুর থাপা এবং ইকোসকের সহসভাপতি ও আলজেরিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করেছে। সেখানে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) প্রণীত পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর স্থায়ী মিশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেছে বাংলাদেশ।

সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা অর্থনৈতিক অভিঘাতের কারণে এলডিসি উত্তরণের জন্য নির্ধারিত পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকাল পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় প্রভাব ফেলেছে। তাই উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর আবেদনকে সরকার পিছিয়ে পড়ার পদক্ষেপ হিসেবে নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল ও টেকসই উত্তরণের অংশ হিসেবে দেখছে।

সরকার আরও জানিয়েছে, বর্তমান প্রশাসন একটি নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ, রপ্তানি এবং রাজস্ব আদায়ের গতি পুনরুদ্ধারে সময় প্রয়োজন। অতিরিক্ত তিন বছর সময় দেশের প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল সময় বৃদ্ধি নয়, সেই সময়কে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখা জরুরি। পাশাপাশি পাঁচ বছর মেয়াদি 'স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি' দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

অন্যদিকে, বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ড. মোস্তফা আবিদ খান মনে করেন, এলডিসি-পরবর্তী আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের সামনে ব্যাপক সংস্কারের বিকল্প নেই। বিশেষ করে কাস্টমস ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, দ্রুত ও দক্ষ করে তুলতে হবে, যাতে আমদানি ও রপ্তানি-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।

বাংলাদেশের এই আবেদন মূলত উন্নয়নের গতি ধরে রেখে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরির একটি কৌশলগত প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন ইকোসকের সুপারিশ এবং পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, টেকসই উত্তরণের পথে বাংলাদেশ কতটা অতিরিক্ত সময় পাবে।