জসিম উদ্দীন মাহমুদ তালুকদার

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬ , ০৬:১৬ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

জলকদর এর কদর কিন্তু অধিকতর

বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলাতে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী জলকদর খালটি কোনো মানবসৃষ্ট বা নির্দিষ্ট কোনো সনে খনন করা কৃত্রিম খাল নয়; এটি একটি প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্টি হওয়া প্রাচীন প্রবহমান জোয়ার-ভাটার টাইডাল খাল। সাঙ্গু নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে বাঁশখালীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। সমাপ্তি হয় দক্ষিণ চট্রগ্রামের বাঁশখালী পার হয়ে বঙ্গোপসাগরের কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া প্রণালীতে মিশে। সম্রাট অশোকের সময়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপকূলীয় ভূপ্রকৃতি ও নদীর গতিপথ বর্তমানের মতো ছিল না। এই অঞ্চলের অনেক নদী ও খাল পরবর্তী কয়েকশ বছরের প্রাকৃতিক ভাবে ও মানবসৃষ্ট উপায়ে পরিবর্তিত হয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে, ১৭ শতকের প্রথমার্ধে বা ১৮ শতকের শুরুতে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার শাসনকর্তা নবাব জলকদর খানের নামানুসারে অথবা তাঁর আমলে এই খালের খনন ও বিকাশ ঘটেছিল।

ব্রিটিশ আমল থেকেই বাংলাদেশের বাঁশখালী উপজেলার জলকদর খাল যাতায়াত, রাজনৈতিক, বাণিজ্য এবং পানিনিষ্কাশনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এই খালটি একসময় বাঁশখালীর অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল। ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব: প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম মোগল ও ব্রিটিশ আমল থেকেই এই খাল দিয়ে লঞ্চ, স্টিমার ও সাম্পানযোগে লক্ষ লক্ষ মানুষ দেশ-বিদেশে যাতায়াত করত। বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক পথ হিসেবে নৌপথে সভা সমাবেশ যোগদান সহ ব্যবসায়ীরা ধান, লবণ, মাছ ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল আনা-নেওয়া করতেন। কৃষি ও পরিবেশ: জোয়ার-ভাটার পানি নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষিজমিতে সেচ প্রদানের জন্য এই খালটি বিশেষভাবে ব্যবহৃত হতো। আজ খালটি খননের অভাবে মৃতপ্রায়। জলকদর খাল সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গরূপে খনন করা হয়েছিল প্রায় ৪৫ বছর আগে। দীর্ঘ এই বিরতির পর ২০২৬ সালের ১৮ মে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচির অংশ হিসেবে এর আংশিক পুনঃখনন কাজ শুরু হয়। খালে ৮৯ টি স্লুইসগেট রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জলকদর খালে ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে উপকূলীয় অঞ্চলে পানি নিষ্কাশন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে বিভিন্ন ধাপে নির্মিত হয় ৮৯ টি স্লুইসগেট । উদ্দেশ্য হলো পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানি নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষি সুরক্ষা কাজে। বর্তমান স্লুইসগেট গুলোর অবস্থা দীর্ঘ সময় সংস্কার না করায় অধিকাংশেরই মেয়াদোত্তীর্ণ ও অচল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় জলকদর খালটি পুনঃখনন জরুরী। সড়ক যেমন মানুষের যাতায়াত ও যোগাযোগের জন্য অপরিহার্য, ঠিক তেমনি খাল ও জলাশয় খনন পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ও নিষ্কাশনের জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য। মানব সভ্যতা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পানির চলাচলের পথ উন্মুক্ত রাখার গুরুত্ব আরো অপরিসীম। জলাবদ্ধতা ও বন্যা হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে খাল- বিলের ছড়া ভরাট হয়ে যাওয়াতেই বর্ষার অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারছেনা , যার ফলে শহর ও গ্রামে স্থায়ী জলাবদ্ধতা ও বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে। খাল খনন করে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখলেই জলাবদ্ধতা দূর হবে বলে মনে করি।