ভাষা নির্বাচন / Select Language
  • 🇧🇩
    বাংলা মূল ভাষা (Original)
  • 🇺🇸
    English English
কাজী রাহাত শামস • প্রকাশিত: ৩০ ডিসেম্বার ২০২৫, ০৭:২০ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি

আপোষহীন নেত্রী খালেদা জিয়া আর নেই

অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি দীর্ঘ, সংঘর্ষময় ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় আজ চূড়ান্তভাবে সমাপ্ত হলো। সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির চেয়ারপারসন এবং আপোষহীন নেতৃত্বের প্রতীক খালেদা জিয়ার মৃত্যু কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রীর বিদায় নয়, এটি মূলত স্বাধীনতার পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের ধারায় গণতন্ত্র, ক্ষমতা ও প্রতিরোধের এক দীর্ঘ সংগ্রামের অবসান। জীবন সায়াহ্নে পরিনত হন জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে।

 তাঁর জীবন ক্ষমতার অলিন্দে আরামদায়ক যাত্রা নয়, বরং ছিল বারবার আঘাতপ্রাপ্ত হয়েও উঠে দাঁড়ানোর এক নিরবচ্ছিন্ন ইতিহাস। যেখানে ব্যক্তিগত বেদনা, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও রাজনৈতিক একাকীত্ব মিলেমিশে গড়ে তুলেছিল এক দৃঢ়চেতা চরিত্র।

জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনীতি যখন নেতৃত্বশূন্যতা, সামরিক কর্তৃত্ব ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অস্থির, তখন খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে প্রবেশ ছিল প্রায় অসম্ভব এক সিদ্ধান্ত। রাজনীতির প্রথাগত প্রস্তুতি বা ক্ষমতার উত্তরাধিকার তাঁকে এই পথে আনেনি বরং স্বামী হত্যার বিচারহীনতা, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের দাপট এবং জনগণের মধ্যে জন্ম নেওয়া নীরব অসন্তোষ তাঁকে রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় টেনে আনে। সেই সময় একজন গৃহিণী হিসেবে পরিচিত খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে রূপ নেন আন্দোলনের নেতৃত্বে। যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

আশির দশকের সামরিক স্বৈরতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। কারাবরণ, গৃহবন্দিত্ব, সভা-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা। সবকিছুর মাঝেও তিনি রাজনৈতিক আপসের পথে হাঁটেননি। বরং গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট ও অনমনীয়। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে তাঁর নেতৃত্ব শুধু একটি দলের আন্দোলন ছিল না। সেটি ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে এক বিস্তৃত নাগরিক প্রতিরোধ, যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়েছিল। সেই অভ্যুত্থানই সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে এবং খালেদা জিয়াকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।

তিন দফা প্রধানমন্ত্রিত্বকালে তাঁর শাসনামল ছিল বহুমাত্রিক বিতর্ক ও অর্জনের সমন্বয়। একদিকে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক সংঘাতের অভিযোগ, অন্যদিকে বহুদলীয় রাজনীতির পরিসর টিকিয়ে রাখা, সংবাদমাধ্যমের আপেক্ষিক স্বাধীনতা এবং বিরোধী মতের উপস্থিতি। এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্য দিয়েই তাঁর শাসনকাল মূল্যায়িত হয়। তিনি ছিলেন এমন এক নেত্রী, যিনি ক্ষমতায় থেকেও বিরোধী কণ্ঠের অস্তিত্ব স্বীকার করতে বাধ্য ছিলেন, কারণ তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক উত্থানই হয়েছিল বিরোধিতার মধ্য দিয়ে। এতসব পরিস্থিতিতেও কোন নির্বাচনে তাঁর হারার ইতিহাস নেই ।

পরবর্তী সময়ের রাজনীতি খালেদা জিয়ার জীবনে নিয়ে আসে সবচেয়ে নির্মম অধ্যায়। দীর্ঘ কারাবাস, গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও চিকিৎসাবঞ্চনা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ, এসব তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও গভীর প্রশ্ন তোলে। তবু এই সময়েও তিনি প্রতিশোধের ভাষা ব্যবহার করেননি। বরং বারবার গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও আইনের শাসনের কথাই উচ্চারণ করেছেন। শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান কখনো দুর্বল হয়নি। এটাই তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি ছিল ক্ষমতার চেয়েও রাষ্ট্রের কাঠামোকে ঘিরে। তিনি বিশ্বাস করতেন, শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া কোনো গণতন্ত্র টেকসই হতে পারে না। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি বারবার নির্বাচনী ব্যবস্থা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সাংবিধানিক কাঠামোর প্রশ্নে সোচ্চার ছিলেন। আধিপত্যবাদী প্রবণতা ও এককেন্দ্রিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর আপোষহীন অবস্থান তাঁকে অনেক সময় একাকী করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে তাঁকে পরিণত করেছে প্রতিরোধের প্রতীকে।

আজ তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতি এক শূন্যতার মুখোমুখি। এই শূন্যতা শুধু নেতৃত্বের নয়, বরং একটি ধারার। যেখানে রাজনীতি মানে ছিল ঝুঁকি নেওয়া, কারাবরণ মেনে নেওয়া এবং আদর্শের প্রশ্নে আপস না করা। খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই নির্ধারণ করবে। তবে ইতিহাসের বিচারে তিনি থাকবেন সেই বিরল নেত্রীদের কাতারে, যাঁরা ক্ষমতার চেয়ে সংগ্রামকে বড় করে দেখেছেন। তাঁর বিদায় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক গভীর, নীরব প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিল। এই রাজনীতি কি আবার এমন আপোষহীন নেতৃত্ব দেখতে পাবে?