ঢাকা অফিস

প্রকাশিত: ০২ জুলাই ২০২৬ , ০৬:৪৫ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

‎রাজনৈতিক সহিংসতা ও মব হামলায় জুনে নিহত ৪০ জন: এইচআরএসএস

চলতি বছরের জুন মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ও মব হামলা মিলিয়ে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন, সাংবাদিক হয়রানি, শ্রমিক নির্যাতন এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাও উদ্বেগজনক মাত্রায় ঘটেছে বলে সংগঠনটির মাসিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত জুন ২০২৬-এর মানবাধিকার পরিস্থিতিবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ১৬টি জাতীয় দৈনিক, সংগৃহীত তথ্য এবং ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ মূল্যায়ন তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ৫৮টি ঘটনায় ৯ জন নিহত এবং ৩৪৬ জন আহত হয়েছেন। মে মাসের তুলনায় রাজনৈতিক সহিংসতার মাত্রা বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ), বিএনপি, এনসিপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক সংঘাত, হামলা ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে এসব ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর দুষ্কৃতকারীদের হামলার অন্তত ১২টি ঘটনায় ৯ জন নিহত এবং ২২ জন আহত হয়েছেন।

রাজনৈতিক মামলার চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুন মাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ২২টির বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৬২৭ জনের নাম উল্লেখ করে আরও প্রায় এক হাজার ২৬২ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। একই সময়ে রাজনৈতিক ও অন্যান্য ঘটনায় মোট ২৫৭টি অভিযানে ৪ হাজার ৭৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারদের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অন্তত এক হাজার ৫৫৯ জন নেতা-কর্মী, বিএনপির ৩৫ জন এবং জামায়াতে ইসলামীর দুইজন রয়েছেন।

মব সহিংসতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এইচআরএসএস। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুন মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৬৩টি ঘটনায় ৩১ জন নিহত এবং ৬৯ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা ও মব সহিংসতার ২৯টি ঘটনায় ৬৬ জন সদস্য আহত হয়েছেন।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও সন্তোষজনক নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। জুন মাসে ৩৯টি ঘটনায় ৪৭ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৮ জন আহত, পাঁচজন লাঞ্ছিত, নয়জন হুমকির মুখে পড়েছেন এবং পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। একই সময়ে সাতটি মামলায় ১২ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও সংকোচনের চিত্র উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। জুন মাসে অন্তত ১১টি ঘটনায় ১১ জনকে আটক করা হয়েছে এবং এ-সংক্রান্ত সাতটি মামলা হয়েছে।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, হেফাজতে মৃত্যু ও কারাগারে মৃত্যুর বিষয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে এইচআরএসএস। জুন মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, হেফাজত ও নির্যাতনের ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া গ্রেপ্তার এড়াতে পালানোর সময় চারজন এবং কারাগারে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে। জুন মাসে ১২টি হামলার ঘটনায় সাতজন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ১২টি মন্দির, ১১টি প্রতিমা এবং সাতটি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুন মাসে ৩৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০৬ জন ধর্ষণের শিকার, ১৯ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার এবং ধর্ষণের পর দুই কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে। একই সময়ে ২৯১ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

শ্রমিকদের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জুন মাসে শ্রমিক নির্যাতনের ৫৫টি ঘটনায় ১১ জন নিহত ও ১৮৪ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় আরও ৩৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পাঁচটি ঘটনায় দুইজন নিহত, দুইজন আহত, চারজন গুলিবিদ্ধ এবং একজনকে বিএসএফ আটক করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে তিনজন নিহত হয়েছেন এবং ১২ জনকে আরাকান আর্মি আটক করেছে।

প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতা, মব হামলা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্তে সহিংসতা এবং শ্রমিকদের ওপর হামলার ধারাবাহিকতা দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে। তিনি মানবাধিকার সুরক্ষায় সরকারের জবাবদিহি বাড়ানোর পাশাপাশি নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের আরও সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানান।