ভাষা নির্বাচন / Select Language
  • 🇧🇩
    বাংলা মূল ভাষা (Original)
  • 🇺🇸
    English English
প্রকাশিত: ০২ জুলাই ২০২৬, ১০:৪৩ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

মুক্তিযুদ্ধ, রাষ্ট্রগঠনের লড়াই ও সিরাজুল আলম খান

মুক্তিযুদ্ধ, রাষ্ট্রগঠনের লড়াই ও সিরাজুল আলম খান

সিরাজুল আলম খানকে “ রাজনীতির রহস্যপুরুষ” বলা হয়। কিন্তু এই অভিধার ভেতরে আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক অজ্ঞতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলসেমিও ধরা পড়ে। কারো চিন্তার গভীরতায় পৌঁছাতে না পারলে, তাদের ঘিরেই রহস্যের পর্দা তৈরি করা হয়। সিরাজুল আলম খানকে বুঝতে হলে রহস্য নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক ইতিহাস, রাষ্ট্রতত্ত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের প্রশ্নকে গভীরভাবে বোঝা।

বাংলাদেশ-পূর্ব রাজনীতিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদী ধারার মধ্যে তিনিই সম্ভবত সবচেয়ে অগ্রসর রাজনৈতিক চিন্তার মানুষ ছিলেন। তিনি শুধু একজন সংগঠক ছিলেন না, ছিলেন রাষ্ট্রভাবুক। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার অভিমুখ ছিল রাষ্ট্র নির্মাণের রাজনীতি। পাকিস্তানি উপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতর থেকে তিনি খুব দ্রুত উপলব্ধি করেছিলেন যে, পূর্ববাংলার মানুষের মুক্তি স্বায়ত্তশাসনে সম্ভব নয়, প্রয়োজন পূর্ণ স্বাধীনতা।

তিনি সময়ের অনেক রাজনীতিকের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন । সেই সময় তরুণদের যে অংশটি ধীরে ধীরে পাকিস্তানের কাঠামো থেকে বের হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, সেই ধারার অন্যতম প্রধান মস্তিষ্ক ছিলেন তিনি। নিউক্লিয়াসের সাংগঠনিক তৎপরতা, স্বাধীনতার প্রস্তুতি, রাজনৈতিক স্লোগান নির্মাণ এসব ক্ষেত্রেই তাঁর গভীর প্রভাব ছিল।

৭ মার্চের ভাষণের বহু চিত্তাকর্ষক ও ঐতিহাসিক লাইন তাঁর পরামর্শে তৈরি হয়েছিল বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। তাঁর সুস্পষ্ট মত ছিল, ওই দিনই স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া উচিত। সেটা হয়নি। ইতিহাসে “যদি” বলে কিছু নেই, কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেদিন স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলে ইতিহাসের গতি কি অন্যরকম হতো? সে বিতর্ক আলাদা। তবে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে তিনি হৃদয় দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা চেয়েছিলেন এবং সেই লক্ষ্যে সাংগঠনিকভাবে কাজ করেছিলেন।

স্বাধীনতার পর তাঁর সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের দূরত্ব তৈরি হয় মূলত রাষ্ট্রগঠন প্রশ্নে। এই বিরোধ ব্যক্তিগত ছিল না, ছিল রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক। সিরাজুল আলম খান বুঝতে পেরেছিলেন, পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে না ফেললে স্বাধীন বাংলাদেশেও শোষণের কাঠামো অটুট থাকবে। তিনি চেয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক শক্তিকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন হোক। তিনি মনে করতেন, শেখ মুজিবকে দলীয় সীমার ওপরে তুলে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দাঁড় করানো উচিত।

কিন্তু বাস্তবে যা ঘটল, তা ছিল ভিন্ন। পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষা থেকে উঠে আসা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব স্বাধীনতা পাওয়ার পর অনেকাংশে সেই পাকিস্তানি প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোকেই বজায় রাখল। ঔপনিবেশিক বুরোক্রেসি, কেন্দ্রীভূত প্রশাসন, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থা সবই প্রায় অক্ষত রয়ে গেল। মুক্তিযুদ্ধের যে গণঅংশগ্রহণমূলক চেতনা ছিল, তা ধীরে ধীরে দলীয় রাষ্ট্রে রূপ নিতে শুরু করল।

এই জায়গায় সিরাজুল আলম খানের আপত্তি ছিল। তিনি রাষ্ট্রকে পুনর্গঠনের কথা বলছিলেন। কৃষক-শ্রমিকভিত্তিক অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস, বিকেন্দ্রীকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতা, জনগণের অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র এসব নিয়ে তাঁর চিন্তা ছিল গভীর। এই রাষ্ট্রচিন্তার সবচেয়ে সুসংগঠিত প্রকাশ পাওয়া যায় তাঁর প্রস্তাবিত ১৪ দফায়। সেখানে তিনি এমন এক বাংলাদেশের কথা বলেছিলেন যেখানে ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তে জনগণভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠবে। কৃষক ও শ্রমিকের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, দুর্নীতিনির্ভর আমলাতন্ত্র ভাঙা, স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা এবং মুক্তিযুদ্ধের অংশগ্রহণকারীদের রাষ্ট্রগঠনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রশ্ন ছিল তাঁর ভাবনার কেন্দ্রে। তাঁর দৃষ্টিতে স্বাধীনতা শুধু ভৌগোলিক ছিল না, ছিল রাষ্ট্রের চরিত্র বদলের লড়াই।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তখনকার রাজনৈতিক পরিসরে এসব প্রশ্ন নিয়ে গভীর আলোচনা হয়নি। আজও হয় না। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশ রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত সেই পথে হাঁটেনি। বরং পাকিস্তানি কেন্দ্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর সব উপাদান নতুন রাষ্ট্রে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে গণমানুষের রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে দলীয়করণ, আমলাতন্ত্র এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির ভেতরে হারিয়ে যেতে থাকে।

অনেকে মনে করেন স্বাধীনতার পর তিনি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন। বাস্তবতা তার উল্টো। তিনি নতুন রাজনৈতিক বিকল্প নির্মাণের চেষ্টা করেছিলেন। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এর সাথে যুক্ত হয়ে আওয়ামী লীগের একদলীয় প্রবণতার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। তৎকালীন জাসদ যুদ্ধোত্তর রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে এক ধরনের বিদ্রোহী রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছিল। জাসদের হাজার হাজার কর্মী রক্ষীবাহিনীর হাতে নিহত হন। রাষ্ট্রের সঙ্গে সেই সংঘর্ষ ছিল ভয়াবহ।

পরবর্তীতে জাসদের একটি অংশ, বিশেষত হাসানুল হক ইনুদের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে চলে যায় এবং শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের সহযোগী হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই পরিণতির সঙ্গে সিরাজুল আলম খানের মৌলিক রাজনৈতিক দর্শনের মিল ছিল না। তিনি নিজেই অনেক আগেই সেই ধারার বাইরে সরে গিয়েছিলেন।

তাঁর জীবনের একটি বড় ট্র্যাজেডি হলো, তিনি যেভাবে রাষ্ট্রকে ভাবতেন, বাংলাদেশ সেভাবে রাষ্ট্রকে ভাবার বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা তৈরি করতে পারেনি। ফলে তাঁকে বোঝার বদলে তাঁকে “রহস্যপুরুষ” বানানো সহজ হয়েছে। অথচ তিনি নিয়মিত পড়াশোনা করতেন, রাষ্ট্র, সমাজ, ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে চিন্তা করতেন। তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতা কখনো কেবল প্রকাশ্য মঞ্চনির্ভর ছিল না, বরং ছিল দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার ভেতর দিয়ে।

আমার সাথে আলাপচারিতায় তিনি বলেছিলেন, বাকশাল গঠনের সময় শেখ মুজিব তাঁকে ডেকে বলেছিলেন, “তুই যা চেয়েছিলি তাই করছি, বাকশালে যোগ দে।” জবাবে তিনি বলেছিলেন, “It’s too late.” তিনি বুঝেছিলেন, যখন গণঅংশগ্রহণের বদলে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন কেবল কাঠামোগত পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়ে আর ইতিহাসের গতিপথ ফেরানো যায় না।

সিরাজুল আলম খান বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সংকট অনেক আগেই দেখতে পেয়েছিলেন। রাষ্ট্রের ভেতরে আমলাতন্ত্রের আধিপত্য, দলীয়করণ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা, রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয় এসব নিয়ে তাঁর আশঙ্কা পরবর্তীকালে একে একে সত্য হয়েছে। এ কারণেই তাঁকে কেবল একজন রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্র-সংকটের অন্যতম প্রাথমিক বিশ্লেষক।

তাঁকে নিয়ে আরো সমালোচনা হবে, হওয়া উচিত। তাঁর রাজনৈতিক কৌশল, মুজিব বাহিনী, জাসদের ভূমিকা, সশস্ত্র রাজনীতির প্রশ্ন, এসব নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু সেই আলোচনা হতে হবে ইতিহাস সচেতন, পর্যালোচনামূলক। তাঁকে রহস্যে ঢেকে রেখে নয়, তাঁকে বুঝে। কারণ কোনো জাতি তার চিন্তাবিদদের বুঝতে না পারলে, শেষ পর্যন্ত নিজের রাষ্ট্রকেও বুঝতে পারে না।


লেখক: কবি, রাজনীতিবিদ ও সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য: প্রতিপক্ষ