প্রকাশিত: ২৯ জুন ২০২৬ , ০৮:৩৪ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
জাতীয় সংসদকে ব্যক্তি বন্দনা বা রাজনৈতিক তোষামোদের স্থান নয়, বরং জনগণের প্রতি জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জনগণের করের অর্থে পরিচালিত সংসদে কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রশংসা করতে গিয়ে অন্যের চরিত্রহনন কিংবা কটাক্ষের সংস্কৃতি আর চলতে দেওয়া উচিত নয়।
সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকার ও বিরোধী দলের মতাদর্শ কখনোই এক হতে পারে না। মতপার্থক্যই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। তবে ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও সবাই জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং নিজেদের বিবেক, স্রষ্টা ও জনগণের কাছে সমানভাবে দায়বদ্ধ।
বাজেট অধিবেশনকে বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় অধিবেশন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বাজেটের ওপরই আগামী এক বছরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও রাষ্ট্র পরিচালনার অনেকটাই নির্ভর করবে। তাই প্রতিটি সদস্যের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বক্তব্যে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনকারী আ স ম আবদুর রবের অবদানের কথা স্মরণ করেন। একই সঙ্গে ১৯৯০-এর গণআন্দোলন, ২৮ অক্টোবরের সহিংসতা, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের ঘটনা এবং দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে নিহত ও নির্যাতিতদের প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা জানান।
নিজ দলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, একে একে দলের ১১ জন জ্যেষ্ঠ নেতাকে হারিয়েছেন তারা, আর বর্তমানে তিনি সেই ধারাবাহিকতার জীবিত প্রতিনিধি। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নিহত, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারীদের পাশাপাশি নির্যাতিত পরিবারগুলোর প্রতিও সমবেদনা প্রকাশ করেন তিনি। পিলখানা হত্যাকাণ্ডকে জাতির জন্য গভীর ক্ষত হিসেবে উল্লেখ করে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
সংসদকে একটি চলমান গাড়ির সঙ্গে তুলনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এই প্রতিষ্ঠানের দুটি চাকা হলো সরকার ও বিরোধী দল। একটি চাকা দুর্বল হয়ে পড়লে পুরো সংসদীয় ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই একে অপরকে দুর্বল করার রাজনীতি পরিহার করে পারস্পরিক সম্মান ও গঠনমূলক সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
অতীতে সংসদে ব্যক্তি প্রশংসায় গান, কবিতা কিংবা আবেগঘন বক্তব্যের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তার কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, সংসদ কোনো ব্যক্তিকে খুশি করার মঞ্চ নয়। এটি দায়িত্বশীল বিতর্ক, নীতিনির্ধারণ এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষার জায়গা। তিনি স্পিকারের প্রতি আহ্বান জানান, ভবিষ্যতে যেন সংসদে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও চরিত্রহননের অপসংস্কৃতি পুরোপুরি বন্ধ করা হয়।
প্রস্তাবিত বাজেট সম্পর্কে তিনি বলেন, একটি কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকার অল্প সময়ের মধ্যে বাজেট প্রণয়ন করেছে, যা সহজ কাজ ছিল না। তবে বিরোধী দলের দায়িত্ব হলো একজন সতর্ক প্রহরীর মতো বাজেট পর্যালোচনা করা, যাতে কোথাও জনগণের স্বার্থ ক্ষুণ্ন না হয়, অপচয় বা বৈষম্য সৃষ্টি না হয় এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাজেট আলোচনায় সরকারি ও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আসা যৌক্তিক সুপারিশগুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। এতে সংসদীয় আলোচনা আরও অর্থবহ হবে এবং জনগণের আস্থাও বাড়বে।
বাজেট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সমস্যার দিকও তুলে ধরেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জুলাই থেকে জুন অর্থবছর হওয়ায় বছরের শেষদিকে তড়িঘড়ি করে উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন করার প্রবণতা দেখা যায়, যা অপচয় ও অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি করে। এ কারণে তিনি অর্থবছরকে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণের প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেন।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বলেন, বাজেট সংসদে পাস হলেও এর সফল বাস্তবায়নের দায়িত্ব মূলত রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ ও প্রশাসনের ওপর বর্তায়। তাই জনগণের প্রতিটি টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।