প্রকাশিত: ২৯ জুন ২০২৬ , ০৮:৩৫ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
মুসলিম লীগ ও আওয়ামী লীগকে কেবল দুটি রাজনৈতিক দলের নাম হিসেবে দেখলে বিষয়টি পুরোপুরি বোঝা যায় না। এটি মূলত ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি বনাম জনতার রাজনীতির এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের প্রতীক। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রায়ই দেখা যায়, যে দল ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে একাত্ম হয়, সে মুসলিম লীগীয় রাজনৈতিক চরিত্র ধারণ করে। আর বিরোধী অবস্থানে গিয়ে গণমানুষের দাবি-দাওয়ার পক্ষে দাঁড়ালে 'আওয়ামী' রাজনীতির বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। দলীয় নাম যাই হোক, এই দ্বৈত ধারা এখনও বিভিন্ন রূপে বিদ্যমান।
ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম লীগের শিকড় ছিল উপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার অভিজাত ও জমিদার-নবাব শ্রেণির রাজনীতিতে। অন্যদিকে 'আওয়ামী' ধারার উত্থান ঘটেছিল বঞ্চিত, নিপীড়িত ও সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে। এই ধারার প্রধান রূপকার ছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।
উপমহাদেশের রাজনীতিতে মওলানা ভাসানী একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিভাষা নির্মাণ করেছিলেন। তিনি যার নাম দিয়েছিলেন ‘আওয়ামী রাজনীতি’। তাঁর কাছে ‘আওয়ামী’ শুধু কোনো দলের নাম ছিল না। এটি ছিল জনগণের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, শোষণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার এবং ক্ষমতার কেন্দ্রের পরিবর্তে প্রান্তিক মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এক রাজনৈতিক দর্শন। এই কারণেই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ কিংবা ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি—সব ক্ষেত্রেই তিনি ‘আওয়ামী’ শব্দটিকে গণমানুষের রাজনীতির প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছিলেন।
মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক দর্শনে ‘আওয়ামী’ ছিল মজলুম, কৃষক, শ্রমিক ও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার। তাই যখনই কোনো রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতার কেন্দ্রে গিয়ে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং উপনিবেশিক বা শাসকগোষ্ঠীর রাজনীতির চরিত্র ধারণ করেছে, তিনি তার বিরোধিতা করেছেন। তিনি নিজে ক্ষমতার নয়, বরং আওয়াম বা মজলুম মানুষের পক্ষে থাকার রাজনীতি করেছেন। তাঁর কাছে ‘আওয়ামী রাজনীতি’ ছিল রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের কৌশল নয়, বরং জনগণের মুক্তি ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার রাজনীতি।
সেই আদর্শিক ভিত্তি থেকে আওয়ামী লীগের বিচ্যুতি ঘটেছে অনেক আগেই। সময়ের প্রবাহে দলটি ক্রমশ তার প্রতিষ্ঠাকালীন গণমুখী চরিত্র ও রাজনৈতিক দর্শন থেকে দূরে সরে গেছে।
লেখক: সভাপতি, মওলানা ভাসানী কৃষক সমিতি ও সদস্য সচিব, ভাসানী পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি।