প্রকাশিত: ০২ জুলাই ২০২৬ , ০৫:৫৮ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে রাতের আঁধারে মানুষকে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর অভিযোগ ঘিরে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক মাসে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজারো মানুষকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাদেশ সীমান্তে পাঠানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এদের অধিকাংশই বাঙালি মুসলিম এবং অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বসবাস করছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) অভিযোগ করেছে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে সীমান্ত এলাকায় আলো নিভিয়ে মানুষকে সীমান্ত অতিক্রম করতে বাধ্য করছে। বিজিবির ল্যান্স করপোরাল মাহমুদ মাসুদ বলেন, বিএসএফ অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে এ ধরনের কাজ করছে এবং বাংলাদেশ বারবার মেগাফোনে তাদের এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করার আহ্বান জানাচ্ছে।
বিজিবির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর ভাষ্য, নারী ও শিশুসহ অনেক মানুষকে দুই দেশের মধ্যবর্তী শূন্যরেখায় ফেলে রাখা হচ্ছে। এতে মানবিক সংকট তৈরি হচ্ছে এবং সীমান্তে নিরাপত্তা পরিস্থিতিও জটিল হয়ে উঠছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে এই ধরনের 'পুশ ইন' বা সীমান্ত পেরিয়ে মানুষ ঠেলে পাঠানোর ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক হাজার মানুষকে এভাবে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা হয়েছে। তবে যাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে, তাদের অনেকেই বহু বছর ধরে ভারতে বসবাস করছেন এবং কেউ কেউ কখনো বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসই করেননি।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের প্রায় ৪ হাজার ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ স্থলসীমান্ত। দুই দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের যাতায়াত, পারিবারিক সম্পর্ক এবং অভিবাসনের ইতিহাস রয়েছে। ফলে নাগরিকত্ব নির্ধারণের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই জটিল হয়ে ওঠে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি তথাকথিত 'বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী' ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসন কথিত অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও বহিষ্কারের অভিযান আরও জোরদার করেছে। এ জন্য বিভিন্ন স্থানে 'হোল্ডিং সেন্টার' স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে কাগজপত্রবিহীন ব্যক্তি ও রোহিঙ্গা অভিবাসীদের রাখা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপ্রধান মীনাক্ষী গাঙ্গুলি অভিযোগ করেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মূলত মুসলিম পরিবারগুলোকে লক্ষ্য করে এই বহিষ্কার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাঁর মতে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে মানুষকে সীমান্তে ফেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির পরিপন্থী। তিনি নাগরিকত্ব যাচাইয়ে বাংলাদেশ-ভারতের সমন্বয় এবং প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে তাদের 'ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট' নীতির অংশ। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রায় ১০ হাজার অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং আরও প্রায় ১ হাজার ৮০০ জনকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাও একই ধরনের অবস্থান তুলে ধরে বলেছেন, অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসনের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং একজন অবৈধ অভিবাসীকেও ছাড় দেওয়া হবে না।
বাংলাদেশ সরকার অবশ্য এ ধরনের পদক্ষেপে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। সরকারের পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, কোনো রাষ্ট্র একতরফাভাবে মানুষকে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিতে পারে না। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ঢাকার কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। ফলে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া বিপুলসংখ্যক মানুষকে গ্রহণ করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, ভারতে অবস্থানরত অবৈধ বিদেশিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে ২ হাজার ৬৮০টির বেশি মামলা পাঠানো হলেও অনেকগুলোর নিষ্পত্তি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ ভারতীয় কর্মকর্তা ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, বহিষ্কার কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট দেশের সহযোগিতা প্রয়োজন। বাংলাদেশ পর্যাপ্ত সহযোগিতা না দেওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে ভারত 'পুশব্যাক' নীতি অনুসরণ করছে বলে তিনি দাবি করেন।
প্রতিবেদনে সীমান্ত এলাকার এক ব্যক্তির অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়েছে। অপেল মিয়া নামের ওই ব্যক্তি জানান, প্রায় এক দশক ভারতে বসবাসের পর তাঁকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গভীর রাতে সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর দাবি, সীমান্তের আলো নিভিয়ে গেট খুলে তাঁদের বাংলাদেশে চলে যেতে বলা হয়। অন্ধকারে পরিবার নিয়ে কোথায় যাবেন, সেটিই বুঝতে পারছিলেন না বলে তিনি জানান।
সীমান্ত পরিস্থিতির অবনতির পর বাংলাদেশ সীমান্তে অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েন, গোয়েন্দা নজরদারি এবং ড্রোন পর্যবেক্ষণ জোরদার করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি দ্রুত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।