এখন সময় ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ জুলাই ২০২৬ , ০৫:৫৯ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত, যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে চালু হচ্ছে সরাসরি ‘যোগাযোগ চ্যানেল’

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে নতুন কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কাতারের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ কারিগরি পর্যায়ের আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতির দাবি করেছে মধ্যস্থতাকারী কাতার। একই সঙ্গে সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিরোধ ও অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি সরাসরি ‘যোগাযোগ চ্যানেল’ চালুর ঘোষণা দিয়েছে তেহরান।

বুধবার (১জুলাই) অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে কাতার ও পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা, যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা এবং পারমাণবিক ইস্যুসহ দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার পথ সুগম করা।

বৈঠক শেষে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেন, দুই সপ্তাহ আগে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের সময় যেকোনো অভিযোগ বা বিরোধ দ্রুত জানাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার পর সংলাপ অব্যাহত রাখা এবং ভুল বোঝাবুঝি কমানোর জন্য এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।

গত মাসে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া সমঝোতা স্মারকে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা, সংঘাতের স্থায়ী অবসান এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির একটি সময়সূচি অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে স্মারকের বিভিন্ন ধারা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ব্যাখ্যাগত মতপার্থক্য তৈরি হওয়ায় গত এক সপ্তাহে উভয় পক্ষের মধ্যে সীমিত পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলার ঘটনাও ঘটে।

দোহার বৈঠক শেষে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, আলোচনায় "ইতিবাচক অগ্রগতি" হয়েছে এবং দুই পক্ষ আলোচনা অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছে। তিনি জানান, ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর পরবর্তী বৈঠকের সময় নির্ধারণ করা হবে।

আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও। তিনি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, দোহার আলোচনা ভালোভাবে এগোচ্ছে এবং খুব শিগগিরই পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হতে পারে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আগামী মাসে সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র আর কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেবে না, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। তাঁর ভাষায়, ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে ইরানের পদক্ষেপের ওপর। তবে প্রেসিডেন্ট প্রয়োজন ছাড়া সামরিক ব্যবস্থা নিতে চান না।

এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ইসরায়েলকে হুঁশিয়ার করে বলেছেন, নতুন কোনো হামলা হলে তেহরান তাৎক্ষণিক ও কঠোর জবাব দেবে। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের মিত্রকে নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান জানান।

অর্থনৈতিক বিষয়েও আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান। কাজেম গারিবাবাদি বলেন, জব্দ থাকা ইরানের ৬০০ কোটি ডলারের একটি অংশ প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে ব্যবহারের বিষয়টি কাতারের কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হয়েছে। ইরানের প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি পণ্য কেনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, এই অর্থ কেবল যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য কেনার ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যাবে।

অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক কার্যক্রমও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। মেরিনট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৩৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বৈঠক করেছে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা সেখানে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এ ছাড়া আরব সাগরে একটি মার্কিন এমএইচ-৬০ এস সি হক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার পর নিখোঁজ এক নৌসদস্যকে উদ্ধারে অনুসন্ধান অভিযান চলছে। দুর্ঘটনার কারণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও বুধবার জানায়, অনুমোদিত নৌপথ ব্যবহার না করায় একটি বিদেশি কনটেইনারবাহী জাহাজ আটকে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির সক্ষমতার বার্তা দিতে চাইছে তেহরান।

দিনের শেষ দিকে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হাম্মাদ আল সানি যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত নিরসনে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও আলোচনার অগ্রগতিকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ইরানকে ঘিরে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সঠিক পথে এগোচ্ছে এবং সাম্প্রতিক বৈঠক অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে।

কূটনৈতিক এই অগ্রগতির প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমার সম্ভাবনা এবং সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ হ্রাস পাওয়ায় বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমে ফেব্রুয়ারির পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।