প্রকাশিত: ০৫ জুলাই ২০২৬ , ১০:১৯ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
ভারতের সর্বদক্ষিণের দ্বীপ গ্রেট নিকোবরকে ঘিরে একদিকে কৌশলগত পরিকল্পনা, অন্যদিকে পরিবেশ ও আদিবাসী অধিকার নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। মালাক্কা প্রণালির প্রবেশমুখের কাছে অবস্থিত এই দ্বীপে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারের একটি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। প্রকল্পটিকে সরকার জাতীয় নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক কৌশলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করলেও সমালোচকদের দাবি, এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে দ্বীপের আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও নাজুক পরিবেশকে।
ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত গ্রেট নিকোবর। ভৌগোলিকভাবে এটি থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উপকূলের তুলনায় ভারতের মূল ভূখণ্ডের চেয়ে অনেক কাছাকাছি। ১৯৮৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সফরের পর দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী দ্বীপটি সফর করেননি।
সরকারের অনুমোদিত প্রকল্পের আওতায় গ্রেট নিকোবরে একটি গভীর সমুদ্র ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর, বেসামরিক ও সামরিক উভয় কাজে ব্যবহারের উপযোগী বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পর্যটন অবকাঠামো এবং প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষের জন্য নতুন টাউনশিপ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে দ্বীপটির জনসংখ্যা ১০ হাজারেরও কম।
প্রকল্পটি প্রথমে বাণিজ্যিক উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ভারত সরকার এর কৌশলগত গুরুত্বের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সম্প্রতি সরকার জানিয়েছে, আন্দামান সাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
সাবেক ভারতীয় নৌবাহিনীর উপপ্রধান শেখর সিনহা বলেন, গ্রেট নিকোবরের সবচেয়ে বড় শক্তি এর অবস্থান। মালাক্কা প্রণালির মুখে অবস্থিত হওয়ায় এই দ্বীপ থেকে প্রণালিতে প্রবেশ ও বের হওয়া প্রায় সব ধরনের নৌযান পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ মালাক্কা প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশ সিঙ্গাপুরের কাছে ফিলিপ চ্যানেলে, যার প্রস্থ মাত্র ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পণ্যবাহী জাহাজ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল এই পথ দিয়ে চলাচল করে। বিশেষ করে চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশ এবং মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। ফলে গ্রেট নিকোবরের অবস্থানকে ভারতীয় কৌশলবিদরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
তবে এই উন্নয়ন পরিকল্পনা ঘিরে দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের উদ্বেগও বাড়ছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত ১৬৬ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটার জমি দ্বীপের মোট আয়তনের প্রায় ১৬ শতাংশ। এর উল্লেখযোগ্য অংশ আদিবাসী সংরক্ষিত এলাকার সঙ্গে সংযুক্ত।
গ্রেট নিকোবরে কয়েকশ শম্পেন আদিবাসী এবং কয়েক হাজার নিকোবরি জেলের বসবাস। শম্পেনরা ঘন অরণ্যে বসবাসকারী আধা-যাযাবর শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠী। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য তাদের ভূমি অধিগ্রহণের চেষ্টা চলছে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন আদালতেও মামলা হয়েছে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গণহত্যা প্রতিরোধবিষয়ক ৩৯ জন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে চিঠি দিয়ে সতর্ক করেন, এই প্রকল্প শম্পেন জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
ভারতের পরিবেশমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ৯ লাখ ৬৪ হাজার গাছ কাটা হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে স্থানান্তরিত করতে হবে। আগামী তিন দশকে পরিকল্পিত নতুন বসতি গড়ে উঠলে দ্বীপটির জনসংখ্যা প্রায় ৪ হাজার শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।
পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, ব্যাপক বন উজাড়, উপকূলীয় পরিবর্তন এবং বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণের ফলে গ্রেট নিকোবরের সংবেদনশীল জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। এছাড়া পুরো দ্বীপটি ভূমিকম্পঝুঁকির সর্বোচ্চ শ্রেণি 'সিসমিক জোন-৫'-এ অবস্থিত হওয়ায় বড় ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকিও রয়েছে।
বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী সম্প্রতি গ্রেট নিকোবর সফর শেষে অভিযোগ করেন, উন্নয়নের নামে স্থানীয় মানুষের বসতি ও জীবনধারা ধ্বংস করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, এটি উন্নয়ন নয়, বরং ধ্বংসযজ্ঞকে উন্নয়নের ভাষায় উপস্থাপন করা হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রকল্পের সমর্থকদের মতে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা সময়ের দাবি। দিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি হর্ষ পন্তের মতে, দ্রুত পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ভারতের জন্য নিজের ভৌগোলিক অবস্থানকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে কাজে লাগানো স্বাভাবিক।
তবে শেখর সিনহা মনে করেন, মালাক্কা প্রণালিকে অবরুদ্ধ করার মতো পরিস্থিতি বাস্তবে সহজ নয়। তাঁর মতে, এই জলপথে স্থিতিশীলতা বজায় থাকা ভারতের অর্থনীতির জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে গ্রেট নিকোবরের উন্নয়ন ভারত মহাসাগর অঞ্চলে নজরদারি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং কৌশলগত সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে প্রকল্পটির পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে বিতর্কও আগামী দিনে আরও জোরালো হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।