প্রকাশিত: ২৫ আগষ্ট ২০২৬ , ০৬:১৯ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার ইতিবাচকভাবে দেখছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তবে এখনো বাংলাদেশ চুক্তিতে যোগ দেওয়ার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
মক্কা চুক্তি নিয়ে সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় হুমায়ুন কবির বলেন, ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলে বাংলাদেশ সেটিতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। তিনি জানান, বাংলাদেশের নেতৃত্বকে বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পশ্চিম এশিয়া ও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।
সৌদি আরবের আমন্ত্রণ
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরব বাংলাদেশকে মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে ঠিক কখন এই আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সূত্রটি বিস্তারিত জানায়নি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীও জানিয়েছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়টি ঢাকা ইতিবাচকভাবে দেখছে। তবে ইতিবাচক মনোভাব থাকা আর চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়া এক বিষয় নয়। ফলে বাংলাদেশের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আরও আলোচনা ও মূল্যায়ন প্রয়োজন হবে।
কী এই মক্কা চুক্তি?
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান গত ৭ আগস্ট ২০২৬ সৌদি আরবের মক্কায় একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তির লক্ষ্য হলো তিন দেশের মধ্যে যৌথ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করা।
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। অর্থাৎ তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে অন্য সদস্যদের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতি এতে রয়েছে। এ কারণে চুক্তিটিকে অনেকেই ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নীতির সঙ্গে তুলনা করছেন।
তবে মক্কা চুক্তিকে সরাসরি ‘ইসলামি ন্যাটো’ হিসেবে অভিহিত করা পুরোপুরি যথাযথ নয়। বিশ্লেষকদের মতে, এর কাঠামো ও কার্যক্রম এখনো ন্যাটোর মতো বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অর্জন করেনি।
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে ভারসাম্যপূর্ণ ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে। দেশটি ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে। ফলে কোনো নতুন সামরিক বা নিরাপত্তা জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এই চুক্তিতে যোগ দিলে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তবে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত শুধু ভারতের প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে না। মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী কর্মী, রেমিট্যান্স এবং অর্থনৈতিক স্বার্থও বিষয়টির সঙ্গে জড়িত। ফলে নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কও বিবেচনায় নিতে হবে।
পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন মাত্রা?
মক্কা চুক্তির অন্যতম সদস্য পাকিস্তান। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতির দিকে এগোলেও দুই দেশের মধ্যে ১৯৭১ সালের ইতিহাসসহ বেশ কিছু স্পর্শকাতর বিষয় রয়েছে।
বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে এই চুক্তিতে যোগ দেয়, তাহলে পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতার একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গেও বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ এখনো মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়নি। সরকার শুধু আমন্ত্রণ এবং সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে।
সামনে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে—চুক্তিতে যোগ দিলে দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কীভাবে পরিবর্তিত হবে, এর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব কী হবে এবং ভারতের পাশাপাশি চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে।
ফলে মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন কৌশলগত বিকল্প হিসেবে সামনে এসেছে।