প্রকাশিত: ২৩ আগষ্ট ২০২৬ , ০৫:২৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি ঘাটতিতে কমছে বিদ্যুৎ উৎপাদন; কোথাও ১০–১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং, চাপে শিল্প ও জনজীবন
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও বর্তমানে গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানির সংকটে সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে গিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবারও তীব্র লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় বিদ্যুৎ ঘাটতি এক দিনে ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি পর্যন্ত উঠেছে। কোনো কোনো গ্রামীণ এলাকায় দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার খবরও পাওয়া যাচ্ছে।
প্রশ্ন উঠছে—বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, উৎপাদন সক্ষমতাও আছে, তাহলে মানুষকে আবার কেন অন্ধকারে থাকতে হচ্ছে?
সক্ষমতা আছে, জ্বালানি নেই
বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো গ্যাসের ঘাটতি। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে। একই সময়ে কয়লাভিত্তিক কিছু কেন্দ্রেও জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থাপিত সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে তা পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
ঘাটতির চাপ সবচেয়ে বেশি গ্রামে
বিদ্যুৎ ঘাটতির প্রভাব রাজধানীর তুলনায় দেশের বিভিন্ন জেলা ও গ্রামীণ এলাকায় বেশি পড়ছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে কিছু এলাকায় ১০–১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের কথা উঠে এসেছে। এতে সেচ, ছোট ব্যবসা, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে।
শিল্পাঞ্চলেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানা স্বাভাবিক উৎপাদন চালাতে পারছে না। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিশ্চয়তা একসঙ্গে দেখা দেওয়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়েও তৈরি হচ্ছে ঝুঁকি। শিল্প উদ্যোক্তাদের সংগঠনগুলোও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানিয়েছে।
সংকট কি শুধু সাময়িক?
বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু সাময়িক জ্বালানি ঘাটতি হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল কারণ ধরা পড়বে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ২৩ আগস্ট প্রকাশিত বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দীর্ঘদিনের দুর্বল পরিকল্পনা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ধীরগতি, আমদানিনির্ভরতা, জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নীতিগত অসামঞ্জস্য বর্তমান সংকটকে গভীর করেছে।
২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ এলএনজি আমদানিতে প্রায় ১৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। একই সময়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি রয়ে গেছে বলে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমাধানের পথ কোথায়?
স্বল্পমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি। পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন সক্ষমতা উন্নত করা এবং এলএনজি আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। সিপিডি এরই মধ্যে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা, এলএনজি সংগ্রহের ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের সুপারিশ করেছে।
বাংলাদেশের সামনে তাই প্রশ্ন শুধু ‘বিদ্যুৎ আছে কি নেই’—তা নয়। মূল প্রশ্ন হলো, যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, সেটিকে নির্ভরযোগ্যভাবে চালানোর মতো জ্বালানি ও অবকাঠামো আছে কি না। বর্তমান সংকট সেই প্রশ্নটিই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।