প্রকাশিত: ১৭ জুলাই ২০২৬ , ০৪:২০ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
বাংলাদেশের টেলিভিশন ও অভিনয়শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও দেশীয় নাটক ও অভিনয়শিল্পীদের কর্মপরিসর ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট অভিনয়শিল্পীরা। তাঁদের মতে, বিদেশি ধারাবাহিকের বাংলা ডাব সংস্করণের বিস্তার, শিল্পচর্চায় বিনিয়োগের ঘাটতি এবং দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক নীতির অভাবে শিল্পীরা পেশাগত অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছেন।
গত মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে ছোট পর্দার অভিনয়শিল্পীদের সংগঠন অভিনয়শিল্পী সংঘের বার্ষিক সভায় শিল্পের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অংশ নেওয়া শিল্পীরা দেশীয় বিনোদন শিল্পের টেকসই উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় নীতিগত সহায়তা এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিম বলেন, টেলিভিশন চ্যানেলগুলো তুলনামূলক কম ব্যয়ে বিদেশি সিরিয়াল সংগ্রহ করে বাংলা ভাষায় ডাবিং করে প্রচার করছে। এর ফলে দেশীয় নাটক নির্মাণের পরিমাণ কমছে এবং শিল্পী, নির্মাতা ও কলাকুশলীদের কাজের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। তাঁর মতে, বিদেশি অনুষ্ঠান সম্প্রচার বিষয়ে বিদ্যমান নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হলে দেশীয় শিল্পের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, অনেক শিল্পী ও নির্মাতা বর্তমানে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছেন। তাই শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং নীতিনির্ধারকদের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অভিনেতা ও নির্মাতা তৌকীর আহমেদ বলেন, দেশে টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা বাড়লেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এখন বাণিজ্যিক ও সংবাদভিত্তিক কনটেন্টে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে নাটক, চলচ্চিত্র এবং মঞ্চশিল্পের মতো সৃজনশীল ক্ষেত্রগুলো প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পাচ্ছে না। তাঁর মতে, শিল্পীদের পেশাগত নিরাপত্তা এবং শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনায় বসা জরুরি।
অভিনয়শিল্পী সংঘের সভাপতি আজাদ আবুল কালাম অভিনয়শিল্পীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয়টি সামনে আনেন। তিনি বলেন, অভিনয়কে পূর্ণাঙ্গ পেশা হিসেবে গ্রহণ করেও অনেক শিল্পী সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারছেন না। এই বাস্তবতায় শিল্পীদের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে একটি সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, অর্থনৈতিক সহায়তার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে একে অপরের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করাও শিল্পীদের প্রতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
বার্ষিক সভায় আরও বক্তব্য দেন প্রবীণ অভিনয়শিল্পী মামুনুর রশীদ, দিলারা জামান ও ফেরদৌসী মজুমদারসহ অনেকে। তাঁরা মনে করেন, শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশ কেবল বিনোদনের বিষয় নয়, এটি একটি দেশের সামাজিক ও মানবিক উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাই দেশীয় শিল্পচর্চা টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের অভিনয়শিল্পের সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলো মোকাবিলায় এখনই কার্যকর নীতিমালা, বিনিয়োগ এবং শিল্পীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে আগামী দিনে দেশীয় বিনোদন শিল্প আরও বড় সংকটের মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে, যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে এই শিল্পখাত দেশের সৃজনশীল অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আরও সমৃদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।