এখন সময় ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ জুলাই ২০২৬ , ১১:৫০ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফেদোরভকে অপসারণে ইউক্রেনে বিক্ষোভ

রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যেই ইউক্রেনে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির একটি সিদ্ধান্ত। মাত্র ছয় মাস আগে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া মিখাইলো ফেদোরভকে পদচ্যুত করায় রাজধানী কিয়েভসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভে নেমেছেন হাজারো মানুষ। বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল ‘Hands off Fedorov’ (ফেদোরভকে সরাবেন না) এবং ‘Stop sabotaging victory!’ (বিজয়কে বাধাগ্রস্ত করা বন্ধ করুন) লেখা প্ল্যাকার্ড।

অনেকের মতে, যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সফল ও সংস্কারপন্থী একজন নেতাকে সরিয়ে দিয়ে সরকার ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মাত্র ৩৫ বছর বয়সী মিখাইলো ফেদোরভ ইউক্রেনের নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তিনির্ভর নেতৃত্বের অন্যতম মুখ। ২০১৯ সালে ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কৌশল পরিচালনার মাধ্যমে তিনি জাতীয়ভাবে পরিচিতি পান। পরে দেশটির প্রথম ডিজিটাল রূপান্তরমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি ‘দিয়া’ (Diia) নামের জনপ্রিয় সরকারি সেবা অ্যাপ চালু করেন।

‘রাষ্ট্র এখন স্মার্টফোনে’ এই ধারণাকে সামনে রেখে তৈরি করা অ্যাপটির মাধ্যমে নাগরিকরা গাড়ি নিবন্ধন, বিয়ে, তালাকসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা ঘরে বসেই গ্রহণ করতে পারেন। ইউক্রেনের ডিজিটাল রূপান্তরে তাঁর এই উদ্যোগ ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে।

২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর ফেদোরভের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি প্রকাশ্যে ইলন মাস্কের কাছে আবেদন জানিয়ে ইউক্রেনে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা চালুর উদ্যোগ নেন। যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখতে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চলতি বছর রাশিয়ার অননুমোদিত স্টারলিংক ব্যবহার বন্ধ করতেও তিনি ভূমিকা রাখেন।

এ ছাড়া ‘আর্মি অব ড্রোনস’ কর্মসূচির মাধ্যমে ইউক্রেনের ড্রোননির্ভর সামরিক কৌশলকে নতুন মাত্রা দেন ফেদোরভ। যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য বিশ্লেষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সামরিক ইউনিটগুলোর জন্য প্রণোদনাভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে তিনি দেশটির সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পরও তিনি দুর্নীতিবিরোধী সংস্কার ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে অগ্রাধিকার দেন।

তবে তাঁর সংস্কার কর্মসূচি সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধেরও কারণ হয়ে ওঠে। ফেদোরভ দাবি করেন, তিনি প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে সেনাপ্রধান ওলেক্সান্দর সিরস্কি এবং চিফ অব জেনারেল স্টাফ আন্দ্রি হনতভকে পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত অধিকাংশ সংস্কার সামরিক সদর দপ্তর আটকে দিয়েছে।

জেলেনস্কিও স্বীকার করেছেন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পদ্ধতিগত মতপার্থক্য ছিল। তবে তিনি সেনাপ্রধান সিরস্কিকে অপসারণের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন এবং দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। এর কিছুদিন পরই ফেদোরভকে পদচ্যুত করার সিদ্ধান্ত আসে।

এই সিদ্ধান্তে শুধু সাধারণ মানুষই নয়, সেনাবাহিনীর সদস্য এবং সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। একজন ইউক্রেনীয় সেনাসদস্য বিবিসিকে বলেন, এটি জেলেনস্কির প্রেসিডেন্সিকালের সবচেয়ে বড় ভুল। কিয়েভের এক বিক্ষোভকারী বলেন, ফেদোরভ তাঁর কাজের মাধ্যমে সৈন্যদের আস্থা ও অনুপ্রেরণা অর্জন করেছেন, তাই তাঁর পাশে দাঁড়ানো নাগরিকদের দায়িত্ব।

ফেদোরভকে প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে তিনি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির বিরুদ্ধে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নেই এবং তিনি বিশ্বাস করেন, শেষ পর্যন্ত জনগণের মতামত গুরুত্ব পাবে।

বর্তমানে ইউক্রেনের পার্লামেন্টে নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। তবে ফেদোরভকে ঘিরে যে জনসমর্থন ও বিক্ষোভ দেখা গেছে, তা স্পষ্ট করে যে তিনি কেবল একজন সাবেক মন্ত্রী নন, বরং যুদ্ধকালীন ইউক্রেনে প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তন ও নতুন নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।