প্রকাশিত: ১৭ জুলাই ২০২৬ , ১২:১৪ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
নতুন সহস্রাব্দের সূচনালগ্নে, ২০০০ সালে আমরা ‘এখন সময়’ পত্রিকা প্রকাশ শুরু করি। সে সময় সংবাদপত্র প্রধানত ব্রডশিট ও ট্যাবলয়েড, এই দুই আকারে প্রকাশিত হতো। ডেইলি মিররসহ কয়েকটি ইংরেজি ট্যাবলয়েড পত্রিকা তখন বেশ আলোচিত ও জনপ্রিয় ছিল। তবে ট্যাবলয়েড বলতে শুধু পত্রিকার ছোট আকারকেই বোঝানো হতো না। চটকদার শিরোনাম, উত্তেজনাপূর্ণ সংবাদ, ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি এবং কখনো কখনো অসত্য বা অসম্পূর্ণ তথ্যের মাধ্যমে পাঠককে আকৃষ্ট করার একটি সাংবাদিকতার ধারাও এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিল। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে ‘ট্যাবলয়েড’ শব্দটি অনেক ক্ষেত্রেই অতিরঞ্জিত, চাঞ্চল্যকর এবং বিভ্রান্তিকর সাংবাদিকতার সমার্থক হয়ে উঠেছিল।
ঠিক সেই সময়েই ‘এখন সময়’ ট্যাবলয়েড আকারে আত্মপ্রকাশ করে। পত্রিকাটি ডাবল ক্রাউন কাগজের এক-চতুর্থাংশ, অর্থাৎ প্রচলিত ব্রডশিট পত্রিকার প্রায় অর্ধেক আকারে প্রকাশিত হতো। আকারে ট্যাবলয়েড হলেও প্রচলিত ট্যাবলয়েড সাংবাদিকতার নেতিবাচক প্রবণতা অনুসরণ করা আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না। বরং শুরু থেকেই আমাদের একটি সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ছিল।
ট্যাবলয়েড শব্দটি শুনলে অনেকের মনে প্রথমেই ভেসে ওঠে চটকদার শিরোনাম, অপরাধ, কেলেঙ্কারি, তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন এবং অতিরঞ্জিত সংবাদ। কিন্তু ট্যাবলয়েডের প্রকৃত পরিচয় কেবল এ ধরনের সাংবাদিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ট্যাবলয়েড মূলত সংবাদপত্রের একটি ছোট ও সহজে বহনযোগ্য আকার। পরে এই আকারকে কেন্দ্র করে সংক্ষিপ্ত ভাষা, বড় ছবি, আকর্ষণীয় শিরোনাম এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আগ্রহকে প্রাধান্য দেওয়া সাংবাদিকতার একটি স্বতন্ত্র ধারা গড়ে ওঠে। তাই ট্যাবলয়েডের আকার এবং ট্যাবলয়েড সাংবাদিকতা এক বিষয় নয়। ছোট আকারের একটি সংবাদপত্র দায়িত্বশীল ও গভীর সাংবাদিকতা করতে পারে, আবার বড় আকারের সংবাদপত্রও অতিরঞ্জিত ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ করতে পারে।
ট্যাবলয়েড শব্দটির জন্ম সংবাদপত্রের জগতে নয়। ১৮৮৪ সালে লন্ডনের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বারোজ, ওয়েলকাম অ্যান্ড কোম্পানি সংকুচিত ও ঘনীভূত ওষুধের বড়ি বোঝাতে “Tabloid” নামটি নিবন্ধিত করেছিল। শব্দটি তৈরি হয়েছিল “tablet” শব্দের সঙ্গে “oid” প্রত্যয় যুক্ত করে। এর অর্থ ছিল ট্যাবলেটের মতো ছোট, সংকুচিত ও সহজে ব্যবহারযোগ্য কোনো বস্তু। পরবর্তী সময়ে শব্দটি সাধারণ অর্থে কোনো বড় বিষয়কে ছোট, সংক্ষিপ্ত ও সহজে গ্রহণযোগ্য আকারে উপস্থাপন বোঝাতেও ব্যবহৃত হতে থাকে। বিশ শতকের শুরুতে সংবাদপত্রের সংক্ষিপ্ত ও ঘনীভূত উপস্থাপন বোঝাতে শব্দটি সাংবাদিকতার ভাষায় প্রবেশ করে।
তবে ট্যাবলয়েড সংবাদপত্রের জন্মের আগেই জনপ্রিয় ও উত্তেজনানির্ভর সাংবাদিকতার বিস্তার ঘটেছিল। উনিশ শতকের শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্রে জোসেফ পুলিৎজারের নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড এবং উইলিয়াম র্যান্ডলফ হার্স্টের নিউইয়র্ক জার্নালের মধ্যে পাঠক ও বিক্রি বাড়ানোর তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়। বড় শিরোনাম, আবেগনির্ভর বর্ণনা, অপরাধ, যুদ্ধ, কেলেঙ্কারি এবং কখনো অসমর্থিত তথ্যের ব্যবহারের কারণে এই ধারাটি “ইয়েলো জার্নালিজম” নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণের এই প্রবণতা পরবর্তী ট্যাবলয়েড সাংবাদিকতার জন্য একটি মানসিক ও বাণিজ্যিক ভিত্তি তৈরি করেছিল। তবে ট্যাবলয়েড সাংবাদিকতা এবং ইয়েলো জার্নালিজমও পুরোপুরি একই বিষয় নয়। একটি সংবাদপত্র জনপ্রিয় ও সহজপাঠ্য হয়েও সত্যনিষ্ঠ হতে পারে। (Office of the Historian)
ব্রিটিশ ট্যাবলয়েডের ইতিহাসে ডেইলি মিরর একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। আলফ্রেড হার্মসওয়ার্থ, যিনি পরে লর্ড নর্থক্লিফ নামে পরিচিত হন, ১৯০৩ সালের ২ নভেম্বর লন্ডন থেকে পত্রিকাটি প্রকাশ করেন। প্রথমে এটি ছিল নারীদের জন্য এবং নারীদের পরিচালনায় প্রকাশিত একটি সংবাদপত্র। কিন্তু পাঠকের প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ায় ১৯০৪ সালে পত্রিকাটিকে ছবি-কেন্দ্রিক একটি সাধারণ সংবাদপত্রে রূপান্তর করা হয়। কিছু সময় এর নাম ছিল দ্য ডেইলি ইলাস্ট্রেটেড মিরর। পরে আবার ডেইলি মিরর নামটি ফিরিয়ে আনা হয়। বড় ছবি, সংক্ষিপ্ত সংবাদ এবং সাধারণ মানুষের আগ্রহের বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কারণে এটি ব্রিটিশ জনপ্রিয় সাংবাদিকতার একটি প্রভাবশালী উদাহরণে পরিণত হয়।
ডেইলি মিররের সাফল্য যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্র ব্যবসায়ও প্রভাব ফেলেছিল। শিকাগো ট্রিবিউনের প্রকাশক পরিবারের সদস্য জোসেফ মেডিল প্যাটারসন লন্ডনে ডেইলি মিররের ছোট আকার, ছবি-কেন্দ্রিক বিন্যাস এবং সহজ ভাষার উপস্থাপনা দেখে অনুপ্রাণিত হন। তাঁর উদ্যোগে ১৯১৯ সালের ২৬ জুন নিউইয়র্কে ইলাস্ট্রেটেড ডেইলি নিউজ প্রকাশিত হয়। পরে এর নাম সংক্ষিপ্ত করে ডেইলি নিউজ রাখা হয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নিয়মিত দৈনিক ট্যাবলয়েড হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। (Time)
নিউইয়র্ক ডেইলি নিউজের প্রথম সংখ্যার ঘোষণাতেই এর নতুনত্ব স্পষ্ট ছিল। সংবাদ সংক্ষিপ্ত হবে, ছবি বেশি থাকবে, অক্ষর বড় ও পরিষ্কার হবে এবং একটি সংবাদ অন্য পাতায় অব্যাহত না রেখে একই পাতায় শেষ করার চেষ্টা করা হবে। ছোট আকারের কারণে ট্রেন ও সাবওয়েতে দাঁড়িয়েও পত্রিকাটি সহজে পড়া যেত। নিউইয়র্কের ব্যস্ত শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে এই আকার ও উপস্থাপনপদ্ধতি দ্রুত মানিয়ে যায়। কয়েক বছরের মধ্যেই পত্রিকাটি বিপুল পাঠক অর্জন করে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ট্যাবলয়েড সংবাদপত্রের বিস্তারের পথ তৈরি করে। (Time)
ট্যাবলয়েড সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় ইতিবাচক ভূমিকা হলো, এটি সংবাদকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করেছে। দীর্ঘ ও জটিল ভাষার পরিবর্তে সরাসরি বক্তব্য, বড় ছবি, ছোট প্রতিবেদন, পরিচ্ছন্ন বিন্যাস এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ঘটনা সংবাদপত্রকে আরও গণমুখী করে তোলে। রাজনীতি ও কূটনীতির পাশাপাশি খেলাধুলা, সংস্কৃতি, অপরাধ, নগরজীবন, মানবিক ঘটনা, শ্রমজীবী মানুষের সমস্যা এবং জনস্বার্থের বিষয়ও বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
তবে জনপ্রিয়তার এই শক্তিই কখনো কখনো ট্যাবলয়েডের সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে। পাঠকের কৌতূহল ও আবেগকে কাজে লাগিয়ে কিছু সংবাদপত্র বিক্রি বাড়ানোর জন্য অসমর্থিত অভিযোগ, অর্ধসত্য, ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ, ভয় সৃষ্টিকারী শিরোনাম এবং কৃত্রিম উত্তেজনার আশ্রয় নিয়েছে। কোনো বক্তব্যের একটি অংশ বিচ্ছিন্ন করে এমন শিরোনাম তৈরি করা হয়েছে, যা মূল বক্তব্যের অর্থ বদলে দিয়েছে। পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে। অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ ধরনের সাংবাদিকতা মানুষের আগ্রহ অর্জন করলেও দীর্ঘ মেয়াদে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করে। ইয়েলো জার্নালিজমের ইতিহাসেও দেখা গেছে, অতিরঞ্জন ও যাচাইহীন সংবাদ একসময় পাঠকের অবিশ্বাস সৃষ্টি করেছিল। (The Library of Congress)
ডিজিটাল যুগে ট্যাবলয়েড আর শুধু ছাপা কাগজের একটি আকার নয়। মোবাইল ফোনের পর্দা, নিউজ পোর্টাল, ফেসবুক পোস্ট, ইউটিউব থাম্বনেইল, সংক্ষিপ্ত ভিডিও, পুশ নোটিফিকেশন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিডে ট্যাবলয়েডের নতুন রূপ তৈরি হয়েছে। এখন একটি সংবাদ কতটি কপি বিক্রি করল, শুধু সেটিই বিবেচ্য নয়। কতজন ক্লিক করল, কতক্ষণ ভিডিও দেখল, কতবার শেয়ার করল এবং কতটি মন্তব্য করল, সেগুলোও সংবাদমাধ্যমের বাণিজ্যিক সাফল্যের মাপকাঠিতে পরিণত হয়েছে।
এই প্রতিযোগিতা থেকেই ক্লিকবেইটের বিস্তার ঘটেছে। এমন শিরোনাম দেওয়া হয়, যা পাঠকের মধ্যে কৌতূহল বা ভয় সৃষ্টি করে, কিন্তু পুরো সংবাদ পড়ার পরে দেখা যায় শিরোনামের দাবি প্রতিবেদনের ভেতরে নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশ্নবোধক শিরোনামের আড়ালে ভিত্তিহীন ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কখনো সংবাদসংশ্লিষ্ট নয় এমন নাটকীয় ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে পাঠককে ক্লিক করতে প্রলুব্ধ করা হয়। ডিজিটাল প্রযুক্তি সংবাদকে দ্রুত ও সহজলভ্য করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং আবেগনির্ভর প্রচারকেও দ্রুত বিস্তারের সুযোগ দিয়েছে।
রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের ডিজিটাল নিউজ রিপোর্টে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিও নেটওয়ার্ক এখন বহু দেশে সংবাদ গ্রহণের ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব ওয়েবসাইট ও অ্যাপের চেয়েও এগিয়ে গেছে। বিশ্বব্যাপী ৩০ শতাংশ মানুষ সামাজিক ও ভিডিও প্ল্যাটফর্মকে তাদের প্রধান সংবাদসূত্র বলে উল্লেখ করেছেন। ১২ শতাংশ মানুষ এখন কেবল সামাজিক ও ভিডিও প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই সংবাদ গ্রহণ করেন। এর অর্থ হলো, সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত খবরের সঙ্গে এখন একই পর্দায় ব্যক্তিগত মতামত, রাজনৈতিক প্রচারণা, বিনোদন, বিজ্ঞাপন এবং যাচাইহীন তথ্যও প্রতিযোগিতা করছে।
এই নতুন বাস্তবতায় ট্যাবলয়েডের একটি বিশুদ্ধ ও দায়িত্বশীল ধারা নির্মাণ করা সম্ভব। সেখানে শিরোনাম আকর্ষণীয় হবে, কিন্তু প্রতারণামূলক হবে না। সংবাদ সংক্ষিপ্ত হবে, কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট বাদ দেওয়া হবে না। ছবি শক্তিশালী হবে, কিন্তু বিভ্রান্তিকর হবে না। সংবাদ দ্রুত প্রকাশিত হবে, কিন্তু যাচাই ছাড়া নয়। সংবাদ, মতামত, বিশ্লেষণ ও বিজ্ঞাপনের পার্থক্য স্পষ্ট থাকবে। ভুল হলে তা গোপন না করে দৃশ্যমানভাবে সংশোধন করা হবে। তথ্যের উৎস উল্লেখ করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরিতে স্বচ্ছতা, সূত্রের পরিচয়, দায়িত্ব গ্রহণ এবং প্রকাশ্যে ভুল সংশোধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
“এখন সময়” যে নতুন ট্যাবলয়েড ধারা নির্মাণ করতে চায়, তার মূল ভিত্তি হতে পারে সত্য, দায়িত্বশীলতা এবং সহজ উপস্থাপনা। ট্যাবলয়েড মানেই গুজব, কেলেঙ্কারি বা নিম্নমানের সাংবাদিকতা নয়। এটি হতে পারে আধুনিক মানুষের সময়, পাঠাভ্যাস ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের উপযোগী একটি শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম।
আকারে ছোট হলেও সত্যে ছোট নয়। ভাষায় সহজ হলেও বিশ্লেষণে অগভীর নয়। উপস্থাপনায় আকর্ষণীয় হলেও নীতিতে আপস নয়। দ্রুততায় অগ্রসর হলেও যাচাইয়ে অবহেলা নয়। এই নীতির ওপর দাঁড়িয়ে “এখন সময়” ট্যাবলয়েড সাংবাদিকতার পুরোনো দুর্নাম থেকে বেরিয়ে সত্যনিষ্ঠ, জনমুখী ও বিশ্বাসযোগ্য সংবাদ প্রকাশনার একটি নতুন ধারা সৃষ্টি করতে পারে।