প্রকাশিত: ২০ মার্চ ২০২৬ , ১০:১১ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
ভারতবর্ষের ইতিহাসে এমন কিছু অধ্যায় আছে, যেগুলো শুধু সময়ের পরিমাপে নয়, চেতনার ভেতরেও দীর্ঘস্থায়ী। প্রায় একশ’ বছরের যে শাসনকাল ১৭৫৭ সালের পলাশীর প্রান্তর থেকে শুরু হয়ে ১৮৫৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতনের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়, সেটি তেমনই এক যুগ। যেখানে বাণিজ্য ধীরে ধীরে রাজনীতির রূপ নেয়, আর রাজনীতি পরিণত হয় সাম্রাজ্যিক আধিপত্যে। এই শতাব্দীকে কেবল দখলদারিত্বের ইতিহাস হিসেবে দেখা যেমন সরলীকরণ, তেমনি এটিকে আধুনিকতার সূচনা হিসেবে একমাত্রিকভাবে ব্যাখ্যা করাও একধরনের ঐতিহাসিক অসততা। এটি ছিল বৈপরীত্যে গড়া এক সময় যেখানে শোষণ ও সংস্কার, ধ্বংস ও নির্মাণ, বঞ্চনা ও জাগরণ একসঙ্গে সহাবস্থান করেছে।
পলাশীর যুদ্ধকে আমরা প্রায়ই একটি সামরিক সংঘর্ষ হিসেবে দেখি, কিন্তু এর গভীরতা তার চেয়েও অনেক বেশি। বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন শুধু একটি সিংহাসনের পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল উপমহাদেশে ক্ষমতার নতুন ভাষা প্রতিষ্ঠার সূচনা। মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা, দরবারি ষড়যন্ত্র, এবং স্থানীয় রাজনৈতিক বিভাজন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে এমন এক সুযোগ করে দেয়, যার সদ্ব্যবহার করে তারা বাণিজ্যিক অবস্থান থেকে সরাসরি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ইতিহাসের এই মোড়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্পষ্ট হয়: উপনিবেশ কেবল বাহ্যিক শক্তির আরোপ নয়, অভ্যন্তরীণ দুর্বলতারও প্রতিফলন।
এরপর ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভ কোম্পানির ক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার রাজস্ব আদায়ের অধিকার পেয়ে তারা কার্যত রাষ্ট্রের আর্থিক কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। এই আর্থিক নিয়ন্ত্রণই ছিল সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রকৃত ভিত্তি। রাজস্ব আদায়ের নামে যে কঠোরতা আরোপিত হয়, তা কৃষিজীবী সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে। জমির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, উৎপাদনের ধরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির ভারসাম্য, সবকিছুই ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে। ১৭৯৩ সালের পার্মানেন্ট সেটেলমেন্ট জমিদার শ্রেণিকে শক্তিশালী করলেও কৃষকদের জন্য তা হয়ে ওঠে এক নতুন দাসত্বের কাঠামো, যেখানে উৎপাদনের ঝুঁকি তাদের, কিন্তু লাভের বড় অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে।
এই সময়ের অর্থনৈতিক চিত্র এক গভীর দ্বৈততার প্রতিচ্ছবি। একদিকে ভারত বৈশ্বিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়, নতুন বন্দর, সড়ক এবং বাণিজ্যপথ তৈরি হয়। অন্যদিকে স্থানীয় শিল্প, বিশেষ করে বাংলার বস্ত্রশিল্প, ধীরে ধীরে ধ্বংসের মুখে পড়ে। ইংরেজ শিল্প বিপ্লবের জ্বালানি হিসেবে ভারতীয় কাঁচামাল ব্যবহৃত হয়, আর ভারত নিজেই হয়ে ওঠে প্রস্তুত পণ্যের বাজার। ফলে অর্থনৈতিক সম্পর্কটি হয়ে ওঠে অসম। যেখানে উন্নয়নের ভাষা ব্যবহৃত হলেও বাস্তবে তা ছিল সম্পদ নিষ্কাশনের এক সূক্ষ্ম প্রক্রিয়া।
প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও এই একশ’ বছর ছিল রূপান্তরের সময়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ধীরে ধীরে একটি কেন্দ্রীভূত আমলাতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলে। গভর্নর জেনারেলের পদ সৃষ্টি, কলকাতায় সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা, এবং পরবর্তী আইনগত সংস্কারগুলো প্রশাসনকে নিয়মতান্ত্রিক করে তোলে। Cornwallis Code বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনকে পৃথক করে, এবং একটি আধুনিক প্রশাসনিক রূপরেখার ভিত্তি স্থাপন করে। তবে এই “আধুনিকতা” ছিল মূলত শাসনকে আরও কার্যকর করার হাতিয়ার। এর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল উপনিবেশিক স্বার্থ, জনগণের কল্যাণ নয়।
তবুও এই সময়ের সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার, মুদ্রণযন্ত্রের ব্যবহার, সংবাদপত্রের আবির্ভাব, এবং নতুন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ভারতীয় সমাজে নতুন চিন্তার দিগন্ত উন্মোচন করে। রাজা রামমোহন রায় থেকে শুরু করে পরবর্তী সংস্কারকরা এই নতুন বৌদ্ধিক পরিসরে দাঁড়িয়েই সমাজ সংস্কার ও আধুনিকতার প্রশ্ন উত্থাপন করেন। একই সঙ্গে এই শিক্ষিত শ্রেণিই পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করে। যা উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শক্তি হয়ে ওঠে। অর্থাৎ কোম্পানি যে কাঠামো তৈরি করেছিল, তার ভেতর থেকেই তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা জন্ম নেয়।
রাজনৈতিক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে কোম্পানির কৌশল ছিল বহুমাত্রিক। কোথাও সরাসরি যুদ্ধ, কোথাও জোট, কোথাও subsidiary alliance এই সব কৌশলের মাধ্যমে তারা উপমহাদেশের বিস্তৃত অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। লর্ড ডালহৌসির Doctrine of Lapse দেশীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে এক গভীর অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। কারণ উত্তরাধিকার না থাকলে রাজ্য ব্রিটিশদের অধীনে চলে যেত। এটি শুধু রাজনৈতিক কৌশল ছিল না, এটি ছিল ক্ষমতার এক নতুন নৈতিকতা, যেখানে স্থানীয় ঐতিহ্য ও প্রথাকে অগ্রাহ্য করে ঔপনিবেশিক আইন চাপিয়ে দেওয়া হয়।
এই সমস্ত অসন্তোষ, বঞ্চনা ও অস্থিরতার চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে। মিরাট থেকে শুরু হয়ে দিল্লি, কানপুর, লখনউসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এই বিদ্রোহ ছিল বহুস্তরীয় ক্ষোভের প্রকাশ। সৈন্যদের অসন্তোষ, জমিদারি নীতির প্রভাব, দেশীয় শাসকদের ক্ষমতাচ্যুতি, এবং ধর্মীয়-সামাজিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা। সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে এক জটিল অভ্যুত্থান। যদিও বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি, তবে এটি ব্রিটিশ শাসনের চরিত্র পাল্টে দেয়। ১৮৫৮ সালে কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসন সরাসরি ব্রিটিশ ক্রাউনের হাতে চলে যায়।
এই একশ’ বছরের শাসনকাল তাই কেবল একটি রাজনৈতিক অধ্যায় নয়, এটি একটি সভ্যতার পুনর্গঠনের সময়। এখানে যেমন রয়েছে অর্থনৈতিক শোষণের কঠিন বাস্তবতা, তেমনি রয়েছে আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামোর ভিত্তি। যেমন রয়েছে সামাজিক বৈষম্যের গভীরতা, তেমনি রয়েছে নতুন বৌদ্ধিক জাগরণের সূচনা। এই দ্বৈততাকে বুঝতে পারাই ইতিহাসের প্রতি ন্যায্যতা করা।
আজকের দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রসমূহ: বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান যে প্রশাসনিক কাঠামো, ভূমি-ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতর দাঁড়িয়ে আছে, তার অনেকটাই এই একশ’ বছরের উত্তরাধিকার। তাই এই ইতিহাসকে শুধু অতীত হিসেবে দেখলে ভুল হবে, এটি আমাদের বর্তমানের ভেতরও জীবিত।
শেষ পর্যন্ত, ভারতবর্ষে এই একশ’ বছরের শাসনকাল আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়। ক্ষমতার ইতিহাস কখনো সরলরেখায় চলে না। এটি গড়ে ওঠে সংঘাত, সমঝোতা, বিশ্বাসঘাতকতা এবং পুনর্জাগরণের মধ্য দিয়ে। পলাশীর ময়দান থেকে ১৮৫৭ এর বিদ্রোহ পর্যন্ত যে পথচলা, তা আসলে একটি জাতির আত্মপরিচয় খোঁজার দীর্ঘ যাত্রা। যেখানে পরাজয়ের ভেতরেও ভবিষ্যতের স্বাধীনতার বীজ অঙ্কুরিত হতে থাকে।