কাজী শামসুল হক

প্রকাশিত: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ , ০৭:৫৭ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

রাজনীতি ও নৈতিকতার দ্বন্দ্ব

মানবসভ্যতার ইতিহাস আসলে এক দীর্ঘ নৈতিক পরীক্ষা। রাষ্ট্র, ক্ষমতা, শাসন, এসব কখনোই কেবল প্রশাসনিক কাঠামো ছিল না। এগুলো মানুষের নৈতিক চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। মানুষ যখন একা থাকে, তখন তার নৈতিকতা ব্যক্তিগত, কিন্তু যখন সে শাসক হয়, তখন তার নৈতিকতা হয়ে ওঠে সামাজিক নিয়তি। এখানেই রাজনীতি ও নৈতিকতার গভীর দ্বন্ধের সূচনা। কারণ রাজনীতি শক্তির ভাষায় কথা বলে, আর নৈতিকতা বিবেকের ভাষায়। শক্তি ফলাফল চায়, বিবেক ন্যায় চায়। শক্তি সময়ের দিকে তাকায়, ন্যায় তাকায় আখিরাতের দিকে।

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের কাছেই এই প্রশ্ন প্রথম তাত্ত্বিক রূপ পায়। প্লেটো তার Republic এ বলেছিলেন: রাষ্ট্র তখনই সুস্থ হবে, যখন শাসক হবে দার্শনিক। অর্থাৎ যার হাতে ক্ষমতা, তার ভেতরে থাকতে হবে নৈতিক জ্ঞান। তিনি বুঝেছিলেন ক্ষমতা নিজে সমস্যা নয়, সমস্যা ক্ষমতার চরিত্র। তাই তিনি “philosopher king” ধারণা দেন, ক্ষমতা ও নৈতিকতার মিলন। কিন্তু তার ছাত্র এরিস্টটল বাস্তববাদী ছিলেন। তিনি বললেন, মানুষ নৈতিক হয় অভ্যাসে। রাষ্ট্রের কাজ নৈতিক মানুষ তৈরি করা। অর্থাৎ রাজনীতি নৈতিকতার শিক্ষক।

কিন্তু ইতিহাস অন্য দিকে গেল। রেনেসাঁস যুগে নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি রাজনীতিকে নৈতিকতা থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেললেন। তার The Prince গ্রন্থে শাসককে বলা হয়, শাসন রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন হলে প্রতারণা, ভয়, এমনকি নিষ্ঠুরতাও ব্যবহার করতে হবে। এখানে রাজনীতি হয়ে গেল “ক্ষমতা সংরক্ষণের বিজ্ঞান”। ম্যাকিয়াভেলির বিখ্যাত ধারণা, মানুষ ভালোবাসার চেয়ে ভয় পেলে শাসন স্থায়ী হয়, মানবসভ্যতার রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নগ্ন করে দেয়। তিনি নৈতিকতাকে অস্বীকার করেননি, কিন্তু তিনি দেখিয়েছেন, বাস্তব রাজনীতিতে নৈতিকতা প্রায়ই অকার্যকর হয়ে পড়ে।

এখানেই দ্বন্ধটি প্রকট হয়: রাজনীতি ফল চায়, নৈতিকতা ন্যায় চায়। ফল কখনো ন্যায়বিরোধী হয়। এই দ্বন্ধ আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্বেও রয়েছে। ম্যাক্স ওয়েবার “ethic of responsibility” ও “ethic of conviction” ধারণা দেন। বিশ্বাসের নৈতিকতা বলে: সত্য বলো, অন্যায় করো না। কিন্তু দায়িত্বের নৈতিকতা বলে: রাষ্ট্র রক্ষায় কঠোর সিদ্ধান্ত নিতেও হতে পারে। একজন বিচারক যদি অপরাধীকে শাস্তি দেন, তিনি নৈতিকভাবে কঠোর হলেও সামাজিকভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু একজন শাসক যদি মিথ্যা বলে যুদ্ধ শুরু করেন, তিনি কি ন্যায় করছেন, নাকি ক্ষমতা রক্ষা করছেন? এখানেই নৈতিকতার সীমা ও রাজনীতির বাস্তবতা মুখোমুখি দাঁড়ায়।

ইসলাম এই দ্বন্ধকে ভিন্নভাবে সমাধান করে। ইসলাম রাজনীতিকে নৈতিকতার অধীন করে। কুরআন রাষ্ট্রকে কেবল প্রশাসন বলে না; এটিকে আমানত বলে।

“إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا”

“আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানত তার প্রাপকের কাছে পৌঁছে দাও।” (সূরা নিসা ৪:৫৮)

এখানে শাসন ক্ষমতা নয়, আমানত। অর্থাৎ শাসক মালিক নয়, তত্ত্বাবধায়ক। এই ধারণা রাজনীতির প্রকৃতি বদলে দেয়। ক্ষমতা আর ব্যক্তিগত অর্জন থাকে না, হয়ে যায় নৈতিক দায়িত্ব।

রাসূলুল্লাহ স: বলেছেন: “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সহীহ বুখারি)

এই হাদিস রাষ্ট্রতত্ত্বের একটি মৌলিক নৈতিক কাঠামো তৈরি করে। একজন শাসক তার প্রজার নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও কল্যাণের জন্য জবাবদিহি করবে, মানুষের কাছে না হলেও আল্লাহর কাছে। এখানে রাজনীতি আর কৌশল নয়, হিসাবের পূর্বপ্রস্তুতি।

খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসন এই তত্ত্বের বাস্তব উদাহরণ। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা:) বলেছিলেন, ফোরাত নদীর তীরে একটি কুকুরও যদি ক্ষুধায় মারা যায়, তার জন্য উমর দায়ী হবে। এই বক্তব্য কোনো অলংকার নয়, এটি ইসলামি রাজনৈতিক নৈতিকতার ঘোষণা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, মানবকল্যাণ। অর্থাৎ নৈতিকতা এখানে ব্যক্তিগত চরিত্র নয়, রাষ্ট্রীয় নীতি।

কুরআন আরও কঠোরভাবে সতর্ক করে:

“وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ”

“তোমরা অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভক্ষণ করো না।” ২:১৮৮

এটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কেবল আইন নয়, নৈতিক নিষেধাজ্ঞা। আধুনিক রাষ্ট্রে দুর্নীতি প্রশাসনিক অপরাধ, ইসলামে এটি আধ্যাত্মিক অপরাধ। তাই নবী স: বলেন, ঘুষ গ্রহণকারী ও দাতা উভয়ই অভিশপ্ত।

আধুনিক রাজনৈতিক বিজ্ঞান দেখিয়েছে, নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন রাজনীতি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা “trust” কে রাষ্ট্রের মূল সামাজিক পুঁজি বলেছেন। যখন নাগরিক শাসককে বিশ্বাস করে না, তখন রাষ্ট্র দুর্বল হয়। আবার আমর্ত্য সেন দেখিয়েছেন, দুর্ভিক্ষ খাদ্যের অভাবে নয়, ন্যায়বিচারের অভাবে হয়। অর্থাৎ নৈতিক ব্যর্থতা রাজনৈতিক বিপর্যয় তৈরি করে।

ইতিহাসে দেখা যায়, ক্ষমতা নৈতিকতা হারালে রাষ্ট্র শক্তিশালী হলেও স্থায়ী হয় না। রোমান সাম্রাজ্য সামরিক শক্তিতে অপরাজেয় ছিল কিন্তু অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয়ে পতিত হয়। আব্বাসীয় খিলাফতের শেষ পর্যায়েও একই ঘটনা ঘটে। আধুনিক যুগে অনেক স্বৈরশাসন অর্থনৈতিক উন্নয়ন দেখালেও সামাজিক আস্থাহীনতায় ভেঙে পড়ে। কারণ রাষ্ট্র অস্ত্র দিয়ে টিকে না, বৈধতা দিয়ে টিকে আর বৈধতার ভিত্তি নৈতিকতা।

কুরআন এই সত্যকে নীতিতে রূপ দেয়:

“إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالإِحْسَانِ”

“নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায় ও সদাচারের নির্দেশ দেন।” ১৬:৯০

এখানে “আদল” মানে বিচার, আর “ইহসান” মানে নৈতিক উৎকর্ষ। অর্থাৎ রাষ্ট্র শুধু ন্যায় করলেই যথেষ্ট নয়, নৈতিকও হতে হবে। রাজনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য ক্ষমতা নয়, মানবকল্যাণ।

বাস্তবতা অবশ্য কঠিন। রাজনীতিতে আপস, কৌশল, নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক চাপ, এসব থাকে। তাই ইসলামও সরল আদর্শবাদ নয় কিন্তু এটি নৈতিক সীমা নির্ধারণ করে। যুদ্ধেও নিষিদ্ধ, নিরীহ মানুষ হত্যা, বিশ্বাসঘাতকতা, চুক্তিভঙ্গ। অর্থাৎ লক্ষ্য ন্যায্য হলেও উপায় অন্যায় হতে পারে না। এই নীতি ম্যাকিয়াভেলির ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে, “উদ্দেশ্য উপায়কে বৈধ করে না”।

আজকের বিশ্বে এই দ্বন্ধ আরও গভীর। নির্বাচনী রাজনীতি সংখ্যাগরিষ্ঠতা চায়, নৈতিকতা সত্য চায়। প্রচারণা আবেগ ব্যবহার করে, নৈতিকতা সত্য প্রকাশ করে। ফলে অনেক সময় জনপ্রিয়তা নৈতিকতার বিপরীতে দাঁড়ায়। কিন্তু কুরআন সতর্ক করে:

“অধিকাংশ মানুষের অনুসরণ করলে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে।” (৬:১১৬)

অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নৈতিকতার মানদণ্ড নয়।

বলা যায়, রাজনীতি ও নৈতিকতার দ্বন্ধ আসলে মানুষের আত্মার দ্বন্ধ। মানুষ ক্ষমতা চায়, কিন্তু ন্যায়ও চায়। ক্ষমতা তাকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করে, নৈতিকতা তাকে আখিরাতে প্রতিষ্ঠা করে। যে রাজনীতি নৈতিকতাকে বাদ দেয়, তা শাসন হতে পারে, কিন্তু নেতৃত্ব নয়। আর যে নৈতিকতা বাস্তবতাকে অস্বীকার করে, তা আদর্শ হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র গড়তে পারে না। ইসলামের রাজনৈতিক দর্শন এই দুইয়ের সমন্বয়: নৈতিকতা হবে দিকনির্দেশ, রাজনীতি হবে প্রয়োগ।

তাই শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি রাজনৈতিক নয়, আধ্যাত্মিক। শাসক কেমন, তা রাষ্ট্রের কাঠামো নির্ধারণ করে না; নির্ধারণ করে তার অন্তর। কারণ ক্ষমতা মানুষকে বদলায় না, মানুষকে প্রকাশ করে। আর যে হৃদয়ে আল্লাহর ভয় আছে, তার রাজনীতি ন্যায়বিচারে রূপ নেয়, যে হৃদয়ে ভয় নেই, তার রাজনীতি শক্তির খেলায় পরিণত হয়। এখানেই রাজনীতি ও নৈতিকতার চূড়ান্ত সমাধান আইনে নয়, চরিত্রে।