কাজী শামসুল হক

প্রকাশিত: ২৮ মার্চ ২০২৬ , ০২:০১ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

চল্লিশ থেকে চব্বিশ: একটি জাতির মুক্তি ও মর্যাদার মহাকাব্য

১৯৪০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত এই সুদীর্ঘ ও রক্তপিচ্ছিল পথের আখ্যানটি এখানে তুলে ধরা হলো। কেবল ইতিহাস নয়, একটি জাতির আত্মপরিচয় সন্ধানের এক অবিরাম মহাকাব্য।
চল্লিশ থেকে চব্বিশ, একটি জাতির মুক্তি ও মর্যাদার মহাকাব্য।
ইতিহাসের ধূলিমলিন পাতায় ১৯৪০ সালের সেই লাহোর প্রস্তাবটি ছিল বাঙালি মুসলমানের জন্য প্রথম ভোরের স্বপ্ন। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের বজ্রকণ্ঠে যখন স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম মুসলিম অঞ্চলের দাবি উঠল, তখন এই ভূখণ্ডের অগণিত শোষিত কৃষক ও বঞ্চিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রথমবারের মতো একটি নিজস্ব ঠিকানার সন্ধান পেয়েছিল। সেই আজাদির লড়াই ছিল ব্রিটিশ রাজত্বের শৃঙ্খল ভাঙার পাশাপাশি শত বছরের জমিদার মহাজনদের অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্তির এক প্রবল আকুতি। সেই আকুলতাকে পুঁজি করেই ১৯৪৭'এ মানচিত্র ভাগ হলো, দেশভাগ হলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাঙালি মুসলমানের সেই কাঙ্ক্ষিত মুক্তি এল না। পরাধীনতার লেবাস বদলাল মাত্র, শোষণের কেন্দ্র কলকাতা থেকে সরে গিয়ে করাচি ও লাহোরে স্থানান্তরিত হলো।
পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই সেই স্বপ্নভঙ্গের বেদনা বাঙালিকে নতুন করে ভাবতে শেখাল। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি যখন ঢাকার রাজপথে রফিক, সালাম, বরকতরা বুকের রক্ত ঢেলে দিলেন, তখন বাঙালি মুসলমানের পরিচয় এক নতুন মোড় নিল। এতদিন যারা কেবল ধর্মীয় সত্তাকে আঁকড়ে ধরেছিল, তারা বুঝতে পারল যে ভাষা আর সংস্কৃতি ছাড়া আত্মার মুক্তি অসম্ভব। এই ভাষাগত জাতীয়তাবাদই ছিল মূলত ১৯৭১ এর বীজতলা। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ এই দুই দশকের পথচলা ছিল অত্যন্ত উত্তাল। আইয়ুব খানের সামরিক শাসন, ৬৬ এর ছয় দফা আর ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান ছিল সেই রাজনীতির অগ্নিকুণ্ড। এই পুরো সময়টিতে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজ থেকে শুরু করে গ্রামবাংলার সাধারণ চাষি ও শ্রমিকরা এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সংহতি গড়ে তুলেছিল।
১৯৭১ সাল ছিল বাঙালি মুসলমানের ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর ও রক্তক্ষয়ী মোড়। এখানে একদিকে ছিল ইসলামের নামে অখণ্ড পাকিস্তানের দোহাই, আর অন্যদিকে ছিল নিজ জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। কিন্তু মওলানা ভাসানীর সেই আপসহীন 'খামোশ' আর শেখ মজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ডাক সাধারণ মানুষকে শিখিয়েছিল যে, জুলুমবাজ শাসকের কোনো ধর্ম নেই। তাই টুপি পাঞ্জাবি পরা সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে লুঙ্গি পরা কৃষক আর শাড়ি পরা গৃহিণী সবাই মিলে গড়ে তুললেন এক বিশাল জনযুদ্ধ। ভারতের মাটিতে আশ্রয় নেওয়া কোটি মানুষের আহাজারি আর মুক্তিযোদ্ধাদের মরণপণ লড়াই শেষে ১৬ই ডিসেম্বর এল সেই দীর্ঘপ্রতীক্ষিত আজাদি।
কিন্তু স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশেও মুক্তির সংগ্রাম থামেনি। নব্বইয়ের দশকে যখন সামরিক স্বৈরাচার গণতন্ত্রের গলা টিপে ধরল, তখন আবারও রাজপথে নামল সাধারণ মানুষ। নূর হোসেনের বুকের সেই অক্ষরমালিকা 'স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক' হয়ে উঠল প্রতিটি নাগরিকের প্রাণের দাবি। ছাত্র জনতার সেই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে পতন ঘটল একনায়কত্বের, শুরু হলো সংসদীয় গণতন্ত্রের এক নতুন পথচলা। তবে সময়ের বিবর্তনে সেই গণতন্ত্রও যখন প্রশ্নবিদ্ধ হলো এবং দীর্ঘ দেড় দশকের এক চরম একপাক্ষিক শাসনব্যবস্থা মানুষের টুঁটি চেপে ধরল, তখন জন্ম নিল ২০২৪ এর সেই অভূতপূর্ব বিপ্লব।
২০২৪ এর জুলাই আগস্টের সেই দিনগুলো ছিল আধুনিক বাংলাদেশের জন্য এক দ্বিতীয় আজাদি। আবু সাঈদের বুক পেতে দেওয়া আর মুগ্ধর সেই শেষ আহ্বান 'পানি লাগবে কারো?' এই দৃশ্যগুলো প্রমাণ করল যে, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার সেই লড়াকু রক্ত এখনও এ দেশের তারুণ্যের ধমনিতে প্রবহমান। এই লড়াইয়ে কেবল আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নয় বরং কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্ররা এবং সাধারণ রিকশাচালক ও গার্মেন্টস কর্মীরা যেভাবে জীবন উৎসর্গ করলেন, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। এটি কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের লড়াই ছিল না, এটি ছিল রাষ্ট্রের মেরামতের লড়াই, বৈষম্য বিলোপের লড়াই এবং মানুষের মানবিক মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াই।
চল্লিশ থেকে চব্বিশ এই চৌরাশি বছরের ইতিহাস আসলে এক প্রবহমান নদী। যেখানে বারবার বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা সেই বাঁধ ভেঙে নতুন মোহনায় মিশেছে। বাঙালি মুসলমান আজ আর কেবল একটি ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং সে এক আধুনিক, প্রগতিশীল এবং ইনসাফকামী নাগরিক সত্তা। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বারবার প্রমাণ হয়েছে যে, এ দেশের মানুষ শান্তিকামী কিন্তু তারা দাসে পরিণত হতে জানে না। আত্মত্যাগের এই দীর্ঘ মিছিলই আজ আমাদের এক নতুন বাংলাদেশের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যেখানে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের পরিচয় হবে কেবল তার মর্যাদা ও অধিকার।