প্রকাশিত: ২০ মার্চ ২০২৬ , ১০:০৬ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
পবিত্র ঈদুল ফিতর দরজায় কড়া নাড়ছে। বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহ যখন আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন গাজা থেকে সুদান—যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদগুলোতে বইছে শোক আর হাহাকারের মাতম। যাদের মুখে ঈদের হাসি থাকার কথা ছিল, তাদের চোখে এখন কেবলই মৃত্যুভয় আর অনিশ্চয়তা। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা থেকে শুরু করে সুদান ও ইয়েমেন পর্যন্ত লাখ লাখ অসহায় শিশু, বৃদ্ধ ও নারীর জন্য এবারের ঈদ কোনো উৎসব নয়, বরং বেঁচে থাকার এক চরম লড়াই।
গাজার বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ঘোষিত কথিত যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও সেখানে মানবিক বিপর্যয় থামেনি। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের শুরু পর্যন্ত গাজায় নিহত হয়েছেন ৭১ হাজারের বেশি মানুষ, যাদের সিংহভাগই নারী ও শিশু। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই জনপদে এখন প্রতি পদক্ষেপে মৃত্যুর বিভীষিকা। ঈদের নতুন জামার বদলে শিশুদের গায়ে এখন জীর্ণ পোশাক, আর সেমাই-মিষ্টির বদলে জুটছে সামান্য আটা বা ত্রাণের ডাল। ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজায় বর্তমানে প্রায় ৯৫ হাজার শিশু তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। অপুষ্টির কারণে অনেক শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি থমকে গেছে, আর শত শত শিশু মৃত্যুর প্রহর গুনছে। উত্তর গাজার পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ; সেখানে দুই বছরের কম বয়সী প্রতি ছয়জন শিশুর একজন তীব্র অপুষ্টির শিকার।
গাজার পাশাপাশি সুদান ও ইয়েমেনের অবস্থাও শোচনীয়। সুদানে চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে এবারের ঈদে কয়েক মিলিয়ন শিশু মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় জীবনরক্ষাকারী ওষুধের চালান আটকে আছে। এতে করে কয়েক লাখ অসুস্থ শিশু ও বৃদ্ধ বিনা চিকিৎসায় ধুঁকছে। সুদানের দারফুর ও কর্ডোফান এলাকায় যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ায় অসংখ্য মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে, যেখানে ঈদের খুশি তো দূরের কথা, দুবেলা অন্ন সংস্থানই এক দুঃসাধ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিউইয়র্ক ও বিশ্ব রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের ওপর ইসরায়েলি বিধিনিষেধ এবং রাফাহ ক্রসিংয়ের দীর্ঘসূত্রতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়েও যখন গাজার মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে নিজেদের স্বজনদের খুঁজছে, তখন ঈদের আনন্দ তাদের কাছে এক দূরবর্তী স্বপ্ন মাত্র। গাজার শিশুরা এখন আতশবাজির বদলে বোমার শব্দে আঁতকে ওঠে। তাদের শৈশব কেড়ে নিয়েছে যুদ্ধ, আর ঈদ কেড়ে নিয়েছে অভাব ও বঞ্চনা। অনেক প্রবীণ মানুষ, যারা নিজেদের শেষ বয়সে একটু শান্তিতে উপাসনা করতে চেয়েছিলেন, তাদের সময় কাটছে ভাঙাচোরা তাঁবুতে বা হাসপাতালের বারান্দায়।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নিউজ পোর্টালগুলো যখন ঈদের কেনাকাটা আর সাজসজ্জার খবর প্রচার করছে, তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত এই জনপদগুলো থেকে আসছে লাশের সারি আর ক্ষুধার্ত কান্নার প্রতিধ্বনি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার আহ্বান জানালেও সংঘাতের অবসান বা ত্রাণ সরবরাহে স্থায়ী কোনো সমাধান আসেনি। ফলে এবারের ঈদেও গাজা, সুদান ও ইয়েমেনের অসহায় মানুষগুলোর মুখে হাসি ফুটবে না। ধ্বংসস্তূপের স্তব্ধতা আর প্রিয়জন হারানো নিঃসঙ্গতাই হবে তাদের ঈদের সঙ্গী। বিশ্ববিবেকের কাছে একটাই প্রশ্ন—আর কত রক্ত ঝরলে শান্তিতে ঈদ পালন করতে পারবে এই জনপদের মানুষগুলো?