প্রকাশিত: ০২ এপ্রিল ২০২৬ , ০৪:২৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র (Operation Epic Fury) ফলাফল ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে অবশেষে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প [১.২.২, ১.২.৩]। বুধবার (১ এপ্রিল) ইস্টার্ন টাইম রাত ৯টায় হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিস থেকে দেওয়া এই ভাষণে তিনি ইরানকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে তেহরান আলোচনায় না বসলে দেশটিকে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
এদিকে ট্রাম্পের এই রণহুঙ্কার ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলার হুমকির পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন অস্থিরতার সংকেত দিচ্ছে।
ভাষণের মূল দিক: জয় নাকি ধ্বংসের প্রস্তুতি?
ভাষণের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ‘অকল্পনীয় সাফল্য’ অর্জন করেছে। তার দাবি অনুযায়ী:
নৌ ও বিমানবাহিনী ধ্বংস: ইরানের নৌবাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন এবং বিমানবাহিনীকে অকেজো করে দেওয়া হয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা হ্রাস: দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।কৌশলগত লক্ষ্য: ট্রাম্পের দাবি, ইরানের পারমাণবিক স্বপ্ন নস্যাৎ করা এবং রেভল্যুশনারি গার্ডের (IRGC) কমান্ড নেটওয়ার্ক তছনছ করাই ছিল এই অভিযানের মূল লক্ষ্য, যা এখন শেষের পথে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প যখন ‘বিজয়ের’ কথা বলছেন, তখন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিস্থিতি অন্যরকম। ইরান এখনো নিয়মিতভাবে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
‘প্রস্তর যুগে’ পাঠানোর হুমকি ও তেল রাজনীতি
ভাষণে ট্রাম্প ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো, বিশেষ করে বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি খাতের ওপর ‘স্ম্যাশ অ্যাটাক’ করার হুমকি দেন। তিনি বলেন, "যদি কোনো চুক্তি না হয়, তবে আমরা তাদের প্রতিটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে একযোগে আঘাত হানব। আমরা তাদের পাথর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাব"।এই হুমকির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে:
তেলের বাজারে ধস: ভাষণের কয়েক মিনিটের মধ্যেই ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৪% বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১০৫ ডলারে পৌঁছায়।
হরমুজ প্রণালী: গত এক মাস ধরে ইরান বিশ্বের ২০% তেল সরবরাহের পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে রেখেছে। ট্রাম্প ভাষণে এই সংকটের প্রভাবকে ছোট করে দেখিয়ে বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রণালীর প্রয়োজন নেই"।
আলোচনার ধোঁয়াশা: কে সত্য বলছে?
ট্রাম্প তার বক্তব্যে দাবি করেন যে, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে এবং তারা যুদ্ধবিরতি চায়। তবে তেহরান এই দাবিকে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা বিনিময় হলেও সরাসরি কোনো আলোচনা চলছে না।
নিউইয়র্ক ও প্রবাসীদের মধ্যে উদ্বেগ
নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের বড় শহরগুলোতে বসবাসরত ইরানি-আমেরিকান ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে এই যুদ্ধ নিয়ে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৬% ইরানি-আমেরিকান এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন। নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও এর প্রভাব পড়ছে, বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ: সমাপ্তি নাকি বিস্তার?
পেন্টাগন সূত্রে জানা গেছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে আরও ১০ হাজার অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা চলছে [১.৩.৫]। একদিকে ট্রাম্প বলছেন দুই-তিন সপ্তাহে যুদ্ধ শেষ হবে, অন্যদিকে সামরিক প্রস্তুতি ও অবকাঠামোতে হামলার হুমকি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সংঘাত আরও দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী হতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো ইতিমধ্যে জাতিসংঘে সংঘাত নিরসনের আবেদন জানিয়েছে, কারণ ইরানের পাল্টা হামলায় তাদের তেল শিল্প ও বেসামরিক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাষণ যুদ্ধ থামানোর চেয়ে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার একটি শক্তিশালী ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তেহরান যদি পাল্টাপাল্টি অবস্থানে অটল থাকে, তবে এপ্রিল মাসটি মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বের জন্য একটি চরম অনিশ্চয়তার সময় হতে চলেছে।