নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ , ০৮:০১ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

ইসলামাবাদের ব্যর্থ আলোচনা ও হরমোজ প্রণালীর অবরোধ: মধ্যপ্রাচ্য কি চূড়ান্ত মহাপ্রলয়ের পথে

মধ্যপ্রাচ্যের বারুদঠাসা পরিস্থিতি এখন এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। গত কয়েকদিনের নাটকীয় ঘটনাবলি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বিশ্ব একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং বিধ্বংসী যুদ্ধের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। একদিকে ইসলামাবাদের শান্তি আলোচনার ব্যর্থতা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সামুদ্রিক অবরোধ, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

ইসলামাবাদের সংলাপ ও যুদ্ধবিরতির বর্তমান দশা:

গত ৭ এপ্রিল ২০২৬ এ পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হলেও তা এখন অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। গত শনি ও রবিবার (১১-১২ এপ্রিল) পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে যে ঐতিহাসিক সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, তা কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে মার্কিন প্রতিনিধি দল ইরানের পরমাণু অস্ত্র ত্যাগ করার শর্তে অনড় থাকায় এই সংলাপ ভেস্তে যায়। যদিও দুই পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার কথা বলছে, তবে মাঠের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক ভূমিকা ও হরমোজ অবরোধ:

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও তার 'সর্বোচ্চ চাপ' (Maximum Pressure) নীতিতে ফিরে এসেছেন। শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরপরই তিনি ঘোষণা করেছেন যে, মার্কিন নৌবাহিনী হরমোজ প্রণালীতে একটি পূর্ণাঙ্গ অবরোধ (Blockade) শুরু করবে। আজ সোমবার (১৩ এপ্রিল ২০২৬) সকাল ১০টা (মার্কিন সময়) থেকে এই অবরোধ কার্যকর হওয়ার কথা, যার মূল লক্ষ্য হলো ইরানের বন্দরগুলোতে যাতায়াতকারী সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজ আটকে দেওয়া। ট্রাম্পের সাফ কথা, ইরান যদি আলোচনার টেবিলে ফিরে না আসে বা হরমোজ প্রণালীতে টোল আদায় বন্ধ না করে, তবে তাদের জ্বালানি অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।

পাকিস্তানের কৌশলগত সংযুক্তি ও সংকট:

এই পুরো প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে চমকপ্রদ। ইসলামাবাদ কেবল মধ্যস্থতাকারী হিসেবেই নয়, বরং এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা এড়াতে ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানকে ব্যবহার করে ইরানকে আলোচনার টেবিলে এনেছিল। তবে পাকিস্তানের এই ভূমিকা বর্তমানে চ্যালেঞ্জের মুখে। বিশেষ করে ইসরায়েল যখন পাকিস্তানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একই সাথে, সৌদি আরবের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে পাকিস্তান সেখানে সেনা মোতায়েন শুরু করেছে, যা ইরান পাকিস্তান সম্পর্কে নতুন উত্তাপ ছড়াতে পারে।

ফলাফল ও বর্তমান প্রভাব:

জ্বালানি বাজারে ধস: হরমোজ প্রণালীতে অবরোধের খবরের পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যরল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

মানবিক বিপর্যয়: গাজায় বিগত ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধবিরতি এখন কেবল নামেই টিকে আছে; সেখানে মানবিক সহায়তা ৮০% কমে গেছে এবং প্রতিদিন হামলা অব্যাহত রয়েছে।

ইরানের কঠোর অবস্থান: তেহরান মার্কিন অবরোধকে 'জলদস্যুতা' হিসেবে অভিহিত করেছে এবং হরমোজ প্রণালীতে যেকোনো মার্কিন জাহাজের গতিবিধি কঠোরভাবে দমনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

ভবিষ্যৎ শঙ্কা: সংঘাত না সমাধান?

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সংকেত। যদি আগামী কয়েকদিনের মধ্যে নতুন কোনো কূটনৈতিক জানালা না খোলে, তবে হরমোজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সরাসরি নৌ-সংঘাত শুরু হতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফা সিদ্ধান্ত এবং ইরানের অনমনীয় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যকে এমন এক অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে, যেখান থেকে ফিরে আসা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার হবে। এখন দেখার বিষয়, পাকিস্তান বা অন্য কোনো বিশ্বশক্তি এই দাবানল থামাতে নতুন কোনো 'অফ-র্যাম্প' তৈরি করতে পারে কি না।