-
🇧🇩
বাংলা মূল ভাষা (Original)
-
🇺🇸
English English
বাংলাদেশের সমাজে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর পরিচয়, অধিকার ও স্বীকৃতি নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। বিশেষ করে ‘আদিবাসী’ ও ‘উপজাতি’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মতপার্থক্য রয়েছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বাংলাদেশের সবাইকে ‘অধিবাসী’ হিসেবে পরিচিত হওয়ার কথা বলেছেন এবং দেশে ‘আদিবাসী’ গোষ্ঠী থাকার ধারণার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য নতুন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—পরিচয়ের এই বিতর্কের সমাধান কি কেবল একটি শব্দ নির্ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি এর পেছনে থাকা বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধান করাই বেশি জরুরি? একটি শব্দের চেয়ে বড় হলো মানুষের মর্যাদা। রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের সব নাগরিকের জাতীয় পরিচয় বাংলাদেশি—এতে কোনো বিরোধ থাকার কথা নয়। কিন্তু জাতীয় পরিচয়ের পাশাপাশি মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও নিজস্ব জনগোষ্ঠীগত পরিচয়ও রয়েছে। একজন নাগরিক একই সঙ্গে বাংলাদেশি এবং কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর সদস্য হতে পারেন। এই দুই পরিচয়কে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানো কতটা যৌক্তিক, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।
‘আদিবাসী’ শব্দটি নিয়ে আপত্তির পেছনে সাংবিধানিক ব্যাখ্যা, ইতিহাস এবং রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অনেক মানুষ নিজেদের ঐতিহাসিক পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান। এক পক্ষের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে অন্য পক্ষের অস্তিত্ব ও অনুভূতিকে উপেক্ষা করলে বিতর্ক কমার বদলে আরও গভীর হতে পারে।
তাই প্রথম প্রয়োজন, শব্দের বিতর্ককে শত্রুতার বিষয়ে পরিণত না করা। কোনো শব্দের ব্যবহার নিয়ে দ্বিমত থাকতেই পারে। কিন্তু সেই দ্বিমত যেন কোনো জনগোষ্ঠীকে অপমান করা, তাদের সংস্কৃতিকে ছোট করা কিংবা তাদের নাগরিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার অজুহাত না হয়। একইভাবে, পরিচয়ের প্রশ্নে ভিন্নমত পোষণ করলেই কাউকে দেশের বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করাও গ্রহণযোগ্য নয়। তাহলে সহজ সমাধান কী?
প্রথমত, সরকারকে সংশ্লিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, স্থানীয় জনগণ, গবেষক, আইনজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে অর্থবহ সংলাপে বসতে হবে। আলোচনার লক্ষ্য হবে কাউকে জোর করে একটি পরিচয় গ্রহণ করানো নয়; বরং কোন শব্দের সাংবিধানিক, ঐতিহাসিক ও সামাজিক তাৎপর্য কী, তা যুক্তির ভিত্তিতে স্পষ্ট করা। পরিচয়ের প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট মানুষের বক্তব্য শোনা এই প্রক্রিয়ার অপরিহার্য অংশ। দ্বিতীয়ত, পরিচয়ের বিতর্কের পাশাপাশি ভূমির অধিকার, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় উন্নয়নের মতো বাস্তব বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে দীর্ঘদিনের বিরোধ ও অবিশ্বাস দূর করতে ন্যায়বিচার, কার্যকর প্রশাসন এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান জরুরি। সমতলের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও তাদের অধিকার ও উন্নয়নের প্রশ্নে একই গুরুত্ব থাকা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রকে এমন একটি নীতি গ্রহণ করতে হবে, যেখানে জাতীয় ঐক্য এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য পরস্পরের পরিপূরক হবে। জাতীয় পরিচয় সবার মধ্যে ঐক্য তৈরি করবে, আর নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি সম্মান মানুষকে রাষ্ট্রের সঙ্গে আরও সম্পৃক্ত করবে। ঐক্য প্রতিষ্ঠার অর্থ সবাইকে সাংস্কৃতিকভাবে একরকম করে তোলা নয়; বরং ভিন্নতা সত্ত্বেও সবাইকে সমান মর্যাদা দেওয়া।
চতুর্থত, রাজনৈতিক বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। উসকানিমূলক মন্তব্য, গুজব কিংবা কোনো জনগোষ্ঠী সম্পর্কে সাধারণীকরণ পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করতে পারে। সরকার, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের দায়িত্ব হবে তথ্যনির্ভর আলোচনা উৎসাহিত করা এবং কোনো পক্ষের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানো থেকে বিরত থাকা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রশ্ন এবং বাস্তব সংঘাতের কারণ এক জিনিস নয়। কোথাও ভূমি নিয়ে বিরোধ, কোথাও নিরাপত্তাহীনতা, কোথাও প্রতিনিধিত্ব ও আস্থার সংকট থাকতে পারে। এসব সমস্যার কারণ নির্ণয় না করে শুধু পরিচয়ের শব্দ বদলে দিলেই সব বিরোধ মিটে যাবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে তাই একটি বৃহত্তর আলোচনার সূচনা হিসেবে দেখা যেতে পারে। লক্ষ্য হওয়া উচিত কে কোন শব্দ ব্যবহার করবে, সেই বিতর্কে বিজয়ী নির্ধারণ করা নয়; বরং এমন একটি সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে কেউ নিজের পরিচয়ের কারণে অবহেলিত বা অনিরাপদ বোধ করবেন না। বাংলাদেশের শক্তি তার মানুষ, ইতিহাস এবং বৈচিত্র্যের মধ্যে। জাতীয় ঐক্য রক্ষা করতে হলে যেমন অভিন্ন নাগরিক পরিচয়কে গুরুত্ব দিতে হবে, তেমনি মানুষের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও ন্যায্য অধিকারকেও সম্মান করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু—কে আদিবাসী, কে উপজাতি, আর কে অধিবাসী—তা নয়। বড় প্রশ্ন হলো, এই দেশের প্রত্যেক মানুষ কি সমান মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার পাচ্ছেন? সেই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত করতে পারলেই পরিচয়ের বিতর্ককে সংঘাতের উৎস না বানিয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়ার পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
লেখক: সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক