ভাষা নির্বাচন / Select Language
  • 🇧🇩
    বাংলা মূল ভাষা (Original)
  • 🇺🇸
    English English
প্রকাশিত: ২১ অক্টোবার ২০২৬, ০৯:৫১ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই হোক বিচারের মাপকাঠি

অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই হোক বিচারের মাপকাঠি

বাংলাদেশে ধর্ষণ, নারী নির্যাতন ও শিশু হত্যার মতো অপরাধ নিয়ে যখনই কোনো মর্মান্তিক ঘটনা সামনে আসে, তখনই দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উত্তাল হয়, রাজপথে মানববন্ধন হয়, শাস্তির দাবিতে স্লোগান ওঠে। গণমাধ্যমে চলে আলোচনা, রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে অনেক ঘটনার আলোচনা স্তিমিত হয়ে আসে। ভুক্তভোগী পরিবারকে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, আর সাধারণ মানুষের মনে জন্ম নেয় একটি কঠিন প্রশ্ন—অপরাধের বিচার কি সত্যিই নিশ্চিত হচ্ছে?

এটি কেবল আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।

আলোচিত ঘটনা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিচার কোথায়?

বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া একাধিক আলোচিত যৌন সহিংসতার ঘটনা মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুল আলোচিত ধর্ষণ কেলেঙ্কারি, সিলেটে খাদিজার ওপর বর্বর হামলা, কুমিল্লার তনু হত্যা, নোয়াখালীর সুবর্ণচরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং সিলেটের এমসি কলেজে সংঘটিত সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা আজও জনপরিসরে বিচার, নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিয়ে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

এসব ঘটনার প্রেক্ষাপট, তদন্ত ও বিচারিক পরিণতি এক নয়। কোনো ঘটনায় অভিযুক্তের বিচার হয়েছে, কোথাও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, আবার কোনো ঘটনায় অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়েছে। তাই প্রতিটি মামলার বর্তমান অবস্থা যাচাই করা জরুরি। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—কোনো অপরাধের বিচার নিয়ে জনমনে দীর্ঘস্থায়ী সংশয় তৈরি হলে তা আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থাকে দুর্বল করে।

একটি অপরাধের বিচার হওয়া যেমন জরুরি, তেমনি সেই বিচার হতে হবে নিরপেক্ষ, প্রমাণনির্ভর এবং আইনসম্মত। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা অর্থনৈতিক প্রভাব যেন ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

ক্ষমতার ছায়ায় অপরাধের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে

অপরাধী যদি রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থবিত্ত, দলীয় প্রভাব কিংবা প্রশাসনিক যোগাযোগ ব্যবহার করে তদন্ত ও বিচারকে প্রভাবিত করতে পারে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ ভেঙে পড়ে। ভুক্তভোগী পরিবারও ন্যায়বিচার চাওয়ার ক্ষেত্রে ভয় ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়।

কোনো দলের পরিচয় অপরাধের দায়মুক্তি দিতে পারে না। ক্ষমতাসীন কিংবা বিরোধী—যে পক্ষেরই কেউ অপরাধে জড়িত থাকুক, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আদালতে প্রমাণিত অপরাধের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

রাজনৈতিক নেতাদেরও মনে রাখতে হবে, অপরাধের ঘটনায় দলীয় কর্মীকে রক্ষা করার চেষ্টা কোনো রাজনৈতিক সাফল্য নয়; বরং তা জনগণের আস্থা হারানোর কারণ হতে পারে। অপরাধীর পক্ষে প্রভাব খাটানোর পরিবর্তে বিচারপ্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করাই হওয়া উচিত রাজনৈতিক দায়িত্বের পরিচয়।

ধর্ষণের শাস্তি: কঠোর আইনই কি যথেষ্ট?

ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধে কঠোর শাস্তির দাবি জনমনে স্বাভাবিকভাবেই জোরালো। বাংলাদেশে প্রচলিত আইনে ধর্ষণের নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়—আইনে শাস্তির বিধান থাকার পরও অপরাধ প্রতিরোধে প্রত্যাশিত অগ্রগতি কেন সব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান নয়?

এর উত্তর খুঁজতে হলে শুধু শাস্তির মাত্রা নয়, পুরো বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা পর্যালোচনা করতে হবে।

প্রথমত, অপরাধের অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরপেক্ষ ও পেশাদার তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভুক্তভোগীর চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, আইনি সহযোগিতা এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, সাক্ষী ও ভুক্তভোগী পরিবারকে ভয়ভীতি ও চাপ থেকে সুরক্ষা দিতে হবে। চতুর্থত, মামলার তদন্ত ও বিচার অযৌক্তিকভাবে দীর্ঘায়িত হওয়া ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

কঠোর শাস্তির পাশাপাশি অপরাধীর শনাক্ত হওয়া, অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এবং আইন অনুযায়ী শাস্তি কার্যকর হওয়ার নিশ্চয়তাও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু শাস্তির ভয় দেখিয়ে নয়, অপরাধ করে পার পাওয়া যাবে না—এই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই আইনের প্রতি আস্থা বাড়ানো সম্ভব।

ভুক্তভোগীর পোশাক নয়, অপরাধীর দায়ই হোক আলোচনার কেন্দ্র

যৌন সহিংসতার কোনো ঘটনা ঘটলে অনেক সময় ভুক্তভোগীর পোশাক, চলাফেরা, ব্যক্তিগত জীবন কিংবা চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এমনকি কখনো কখনো অভিযোগকারীকেই সামাজিক বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক প্রবণতা।

ধর্ষণের দায় কখনো ভুক্তভোগীর পোশাক বা আচরণের ওপর চাপানো যায় না। অপরাধের দায় অপরাধীর, আর অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের।

ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ, অপমানজনক মন্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানি তাঁর কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। গণমাধ্যম, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সাধারণ নাগরিক—সবারই দায়িত্ব হলো ভুক্তভোগীর মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষা করা।

প্রতিবাদ আছে, কিন্তু প্রতিরোধের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

ধর্ষণের ঘটনা ঘটার পর প্রতিবাদ হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু প্রতিবাদ যেন শুধু কয়েক দিনের আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্রে অভিযোগ জানানোর নিরাপদ পরিবেশ, গণপরিবহন ও জনপরিসরে নিরাপত্তা, শিশুদের বয়সোপযোগী নিরাপত্তাশিক্ষা এবং পরিবারে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি পুলিশ, প্রসিকিউশন ও বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

বিশেষ করে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধ প্রতিরোধে অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজসেবামূলক সংগঠন ও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কোনো শিশু বা নারী নির্যাতনের শিকার হলে তাঁকে দোষারোপ না করে নিরাপদে অভিযোগ জানানোর সুযোগ দিতে হবে।

বিদেশের শাস্তির গল্প নয়, কার্যকর ব্যবস্থার শিক্ষা প্রয়োজন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন দেশের ধর্ষণের শাস্তি নিয়ে নানা তালিকা প্রচারিত হয়। এসব তালিকায় অনেক সময় যাচাইহীন, অতিরঞ্জিত কিংবা সম্পূর্ণ ভুল তথ্য থাকে। তাই কোনো দেশের আইন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই না করে সেগুলোকে সত্য হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।

বাংলাদেশের জন্য অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে—বিশেষ করে দ্রুত তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ এবং আইন প্রয়োগের কার্যকারিতার ক্ষেত্রে।

মৃত্যুদণ্ডের দাবি আবেগের বহিঃপ্রকাশ হতে পারে, কিন্তু বিচারব্যবস্থার লক্ষ্য হতে হবে অপরাধের দায় নির্ধারণ করে আইন অনুযায়ী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। নিরপরাধ ব্যক্তির শাস্তি যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি প্রভাবশালী অপরাধীর দায়মুক্তিও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

রাষ্ট্রের কাছে জনগণের প্রশ্ন

নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। কোনো নাগরিক যেন ধর্ষণ, নির্যাতন কিংবা হত্যার শিকার হওয়ার পর বিচার পাওয়ার জন্য বছরের পর বছর অনিশ্চয়তায় না থাকেন—এ নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।

জনগণ জানতে চায়, আলোচিত মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচার কোন পর্যায়ে রয়েছে? অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তি কার্যকরে বিলম্ব কেন হচ্ছে? ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে? রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবমুক্ত তদন্তের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে তথ্য, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে। শুধু আশ্বাস কিংবা প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

শেষ কথয়া : ধর্ষণমুক্ত সমাজ গড়তে চাই কার্যকর ন্যায়বিচার

ধর্ষণ ও নারী-শিশু হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অপরাধীর দায়মুক্তির সংস্কৃতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সামাজিক নীরবতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দুর্বলতা।

আজ প্রয়োজন এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে কোনো নারী বা শিশুকে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হবে না; যেখানে অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধের প্রমাণই বিচারের ভিত্তি হবে; যেখানে ভুক্তভোগীর চরিত্র নিয়ে নয়, অপরাধীর জবাবদিহি নিয়ে আলোচনা হবে।

প্রতিবাদ অবশ্যই চলবে, শাস্তির দাবিও থাকবে। তবে সেই দাবি হতে হবে আইনসম্মত, ন্যায়সংগত এবং কার্যকর বিচার প্রতিষ্ঠার পক্ষে। অপরাধের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক বিচার, দৃষ্টান্তমূলক আইন প্রয়োগ এবং ভুক্তভোগীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে মানুষের আস্থা ফিরবে।

কারণ, একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু কঠোর আইন দিয়ে নয়; বরং সেই আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে কি না, তা দিয়েই নির্ধারিত হয়।