প্রকাশিত: ০৯ জুলাই ২০২৬ , ০৯:০৬ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

ইউক্রেন যুদ্ধকে ‘ন্যাটোর বিরুদ্ধে সংঘাত’ হিসেবে তুলে ধরছে ক্রেমলিন

ইউক্রেন যুদ্ধ চতুর্থ বছর পেরিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রূপ নেওয়ার প্রেক্ষাপটে রাশিয়া ক্রমেই এটিকে শুধু ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ নয়, বরং পুরো ন্যাটোর বিরুদ্ধে একটি বিস্তৃত সংঘাত হিসেবে তুলে ধরার কৌশল গ্রহণ করছে বলে দাবি করেছেন ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ার ব্যাখ্যা রুশ জনগণের কাছে তুলে ধরতেই এই বর্ণনা জোরদার করছে ক্রেমলিন।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক ভিডিওতে দেখা যায়, সামরিক পোশাকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভের কাছ থেকে যুদ্ধ পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফিং নিচ্ছেন। সেখানে গেরাসিমভ দাবি করেন, স্থলযুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে না পেরে ইউক্রেন পশ্চিমা মিত্রদের বোঝানোর চেষ্টা করছে যে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে উদ্যোগ ফিরে পেয়েছে।

এর জবাবে পুতিন বলেন, ২০২২ সালে ঘোষিত ‘ইউক্রেনকে নিরস্ত্রীকরণ’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পশ্চিমা দেশগুলোর ভূমিকা বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এই মূল্যায়ন অপরিহার্য হবে।

একই ভিডিওতে পুতিন দাবি করেন, রুশ বাহিনী পূর্ব ইউক্রেনের কস্তিয়ান্তিনিভকা শহর পুরোপুরি দখলে নিয়েছে এবং চলতি বছরে তিন হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনেছে। তবে ইউক্রেন জানিয়েছে, শহরটির কিছু অংশ এখনও তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ) বলছে, যাচাইকৃত তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাশিয়ার প্রকৃত অগ্রগতি ছিল প্রায় ৯৭ বর্গকিলোমিটার।

আইএসডব্লিউর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতার সঙ্গে সব সময় রুশ সরকারি বক্তব্যের মিল পাওয়া যায় না। সংস্থাটির মতে, তথ্যপ্রবাহের ওপর ক্রেমলিনের কঠোর নিয়ন্ত্রণ রুশ সামরিক সাফল্যের একটি ভিন্ন বর্ণনা তৈরি ও প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি কস্তিয়ান্তিনিভকায় এসে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক সমাধান খুঁজতে পুতিনের প্রতি প্রকাশ্য আহ্বান জানিয়েছেন।

ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক উপপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইহোর রোমানেঙ্কো মনে করেন, ক্রেমলিন এখন জনগণকে বোঝাতে চাইছে যে কয়েক মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকা ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ ন্যাটোর সমর্থনের কারণে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। তাঁর দাবি, সেপ্টেম্বরে রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচন শেষে আংশিক সেনা সমাবেশের জন্যও জনমত প্রস্তুত করা হচ্ছে।

রোমানেঙ্কোর ভাষ্য, রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যাবে এবং নির্বাচনের পর নতুন করে সেনা সমাবেশের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

২০২২ সালে ঘোষিত আংশিক সেনা সমাবেশের পর বড় অঙ্কের আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ এবং অভিবাসীদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে নতুন সেনা সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যায় মস্কো।

এদিকে পুতিনের বক্তব্যের পরদিন ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ প্রকাশ্যে ‘যুদ্ধ’ শব্দটি ব্যবহার করেন। যদিও রাশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ভাষ্যে এ সংঘাতকে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ বলা হয়ে আসছে এবং ‘যুদ্ধ’ শব্দ ব্যবহারের কারণে অতীতে বহু মানুষ শাস্তির মুখে পড়েছেন।

পেসকভ বলেন, শুরুতে এটি বিশেষ সামরিক অভিযান ছিল, কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলোর প্রত্যক্ষ সমর্থনের কারণে এটি এখন প্রকৃত যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, বার্লিন, প্যারিস, দ্য হেগ, অসলো এবং ওয়াশিংটন কিয়েভকে সহায়তা দিয়ে সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করছে।

অন্যদিকে কিয়েভভিত্তিক পেন্টা থিংক ট্যাংকের প্রধান ভলোদিমির ফেসেঙ্কোর মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে চাপ বাড়লেই ক্রেমলিন সংঘাতকে পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। এতে রাশিয়া ইউক্রেনকে দ্রুত পরাজিত করতে না পারার কারণ জনগণের কাছে ব্যাখ্যা করা সহজ হয়।

রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভাও সম্প্রতি অভিযোগ করেন, ন্যাটো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর উন্নত অস্ত্র ইউক্রেনকে সরবরাহ করছে এবং কিয়েভ পশ্চিমা সামরিক জোটকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে চাইছে।

তবে ইউক্রেনীয় সেনাসদস্যরা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। পূর্বাঞ্চলীয় ফ্রন্টে দায়িত্ব পালন করা এক ড্রোন অপারেটর বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের সাফল্যকে আড়াল করতেই ক্রেমলিন পুরো পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বর্ণনা সামনে আনছে। তাঁর দাবি, এটি মূলত অভ্যন্তরীণ জনমত ধরে রাখার একটি রাজনৈতিক কৌশল।