এখন সময় ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ জুলাই ২০২৬ , ০৯:২৫ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রকে এড়িয়ে ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে আগ্রহী উপসাগরীয় দেশগুলো

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে নয়, বরং সরাসরি ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ খুঁজছে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ। ধারাবাহিক কূটনৈতিক বৈঠক ও যোগাযোগ থেকে এমনই ইঙ্গিত মিলেছে।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সম্প্রতি ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরপর সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে বৈঠক হয়। সর্বশেষ কাতার ও সৌদি আরবও যুদ্ধ-পরবর্তী আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সহাবস্থান নিয়ে আলোচনা করেছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, এটি বৃহত্তর একটি আঞ্চলিক উদ্যোগের সূচনা মাত্র এবং সামনে আরও বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচনায় হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের নিরাপত্তা, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ইরানকে দেওয়া যেতে পারে এমন বিভিন্ন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি। একই সময়ে ওয়াশিংটন ও তেহরান যুদ্ধ-পরবর্তী চূড়ান্ত সমঝোতার জন্য আলাদা কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো গোনুল টোলের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা কয়েক বছর ধরেই কমছে। তাই তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরাসরি ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজছে। তাঁর ভাষায়, উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের মধ্যে এবং ইরানের সঙ্গে নতুন নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুললে তা অপ্রত্যাশিত হবে না।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে মতপার্থক্য এখনও বড় ইস্যু হয়ে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো এ জলপথে অবাধ ও বিনা খরচে আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে ইরান দীর্ঘদিন ধরেই এই কৌশলগত প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার পক্ষে।

চ্যাথাম হাউসের গবেষক আনিসেহ বাসিরি তাবরিজি বলেন, হরমুজে বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপকে ইরান তাদের নিরাপত্তার সীমা লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করে।

টেলিগ্রাফের তথ্যে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ভবিষ্যতে "পরিষেবা ফি" চালুর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। এ অর্থ জলপথে মাইন অপসারণ ও নিরাপত্তা ব্যয়ের জন্য ব্যবহার করা হতে পারে। তবে এ তহবিলের ব্যবস্থাপনা, অর্থ সংগ্রহ ও তদারকির দায়িত্ব কার হাতে থাকবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

গোনুল টোলের মতে, ইরান এখন বুঝতে পেরেছে যে তাদের সবচেয়ে কার্যকর কৌশলগত সম্পদ পরমাণু কর্মসূচি নয়, বরং হরমুজ প্রণালি। তাই এই জলপথের ওপর প্রভাব বজায় রাখতে তেহরান সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।

এরই মধ্যে হরমুজ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরান। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রণালিতে কোনো ধরনের মার্কিন হস্তক্ষেপ হলে তার "দ্রুত ও নির্দিষ্ট" জবাব দেওয়া হবে। যদিও বর্তমানে হরমুজ দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সম্প্রতি দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রেকর্ডসংখ্যক নৌযান এই প্রণালি অতিক্রম করেছে।

যুদ্ধবিরতি-পরবর্তী সমঝোতা স্মারক সই হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। উভয় পক্ষই একে অপরকে সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে। তবে মধ্যস্থতাকারী কাতার জানিয়েছে, কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। তেহরানও জানিয়েছে, সমঝোতা বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের একটি নতুন চ্যানেল চালু করা হচ্ছে।

এদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে লক্ষ্যবস্তু করার মন্তব্য করার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সতর্ক করে বলেছেন, দেশটির নেতা বা জনগণের বিরুদ্ধে কোনো হামলা হলে তাৎক্ষণিক ও কঠোর জবাব দেওয়া হবে।

এ ঘটনার প্রতিবাদে জাতিসংঘেও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানিয়েছে ইরান। জাতিসংঘে দেশটির স্থায়ী প্রতিনিধি আমির-সাঈদ ইরাভানি মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে অভিযোগ করেন, ইসরায়েলের এ ধরনের হুমকি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের শামিল এবং নিরাপত্তা পরিষদের নীরবতা ইসরায়েলকে দায়মুক্তি দিচ্ছে।

অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, লেবানন ইস্যুতেও ইরান তার অবস্থান থেকে সরে আসবে না। দোহা ইনস্টিটিউট অব গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক মুহান্নাদ সেলুম বলেন, তেহরানের জন্য লেবাননে প্রভাব ধরে রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের সুযোগও সমান প্রয়োজনীয়।

বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরান হরমুজ প্রণালিকে কৌশলগত চাপ সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সমঝোতার পথ পুরোপুরি বন্ধ করবে না। কারণ তেহরানের প্রয়োজন নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি, আর ওয়াশিংটনের প্রধান অগ্রাধিকার বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ খোলা রাখা।