প্রকাশিত: ২০ জুলাই ২০২৬ , ১২:০৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চের পর্দা নেমেছে। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হলেও এর গল্প শেষ হয়নি। ইতিহাসের প্রথম ৪৮ দলের বিশ্বকাপ ফুটবলপ্রেমীদের উপহার দিয়েছে রোমাঞ্চ, অঘটন, বিতর্ক, নতুন নায়কের উত্থান এবং পুরোনো মহাতারকাদের শেষ আলো ছড়ানোর মুহূর্ত। কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আয়োজনে প্রায় ছয় সপ্তাহের এই মহাযজ্ঞের সমাপ্তি হয়েছে নিউইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে স্পেনের শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে।
কেবল নতুন চ্যাম্পিয়নের জন্ম নয়, এই বিশ্বকাপ স্মরণীয় হয়ে থাকবে মাঠ ও মাঠের বাইরের নানা ঘটনার জন্য। ফিরে দেখা যাক ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত কয়েকটি অধ্যায়।
গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এমবাপ্পের ইতিহাস
টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই গোল্ডেন বুটের লড়াই ছিল দারুণ জমজমাট। লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হালান্ড ও হ্যারি কেইনের মতো তারকারা পাল্লা দিয়ে গোল করেছেন। শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত এই লড়াইয়ের উত্তেজনা ছিল অটুট।
তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে গোল্ডেন বুট নিশ্চিত করেন এমবাপ্পে। তিনটি বিশ্বকাপে মোট ২২ গোল করে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন। ব্যক্তিগত অর্জনের এই লড়াই টুর্নামেন্টজুড়েই সমর্থকদের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছিল।
হার মেনেও প্রশংসায় আর্জেন্টিনা
শিরোপা ধরে রাখতে না পারলেও আর্জেন্টিনার লড়াই বিশ্বকাপের অন্যতম বড় গল্প। নকআউট পর্বে একের পর এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিল লিওনেল স্কালোনির দল। কেপ ভার্দে ও মিসরের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়ে ঘুরে দাঁড়ানো, সুইজারল্যান্ডকে অতিরিক্ত সময়ে হারানো কিংবা সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নাটকীয় জয়, প্রতিটি ম্যাচেই দেখা গেছে তাদের অদম্য মানসিকতা।
সব সময় দৃষ্টিনন্দন ফুটবল খেলতে না পারলেও কঠিন মুহূর্তে নিজেদের সেরাটা বের করে আনার ক্ষমতাই ছিল দলের সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই লড়াকু মানসিকতায় টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠলেও শেষ পর্যন্ত স্পেনের কাছে হার মানতে হয়েছে আর্জেন্টিনাকে।
বালোগান বিতর্কে কেঁপেছে ফুটবল বিশ্ব
মাঠের খেলার বাইরেও এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল মার্কিন ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানকে ঘিরে বিতর্ক। শেষ বত্রিশে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে লাল কার্ড দেখার পর নিয়ম অনুযায়ী তাঁর এক ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা হওয়ার কথা ছিল। ফলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে তাঁর খেলার সুযোগ ছিল না।
তবে নিষেধাজ্ঞার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে বালোগানের শাস্তি ১২ মাসের জন্য স্থগিত করা হয় এবং তিনি খেলতে পারেন। ট্রাম্প প্রশাসনের এই হস্তক্ষেপ এবং ফিফার সিদ্ধান্ত বিশ্ব ফুটবলে রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। যদিও মাঠের পারফরম্যান্সে বালোগান কিংবা যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
ছোট দলের বড় গল্প
বিশ্বকাপের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলোর জন্ম দিয়েছে তথাকথিত ছোট দলগুলো। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া কেপ ভার্দে গ্রুপ পর্বে অপরাজিত থেকে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে সবাইকে চমকে দেয়। স্পেন ও উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দলকে পেছনে ফেলে তাদের এই সাফল্য ছিল টুর্নামেন্টের অন্যতম রূপকথা। নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও তারা দারুণ লড়াই উপহার দেয়।
অন্যদিকে, জনসংখ্যার বিচারে সবচেয়ে ছোট অংশগ্রহণকারী দেশ কুরাসাও জার্মানির কাছে বড় ব্যবধানে হারলেও ইকুয়েডরের বিপক্ষে ড্র করে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দেয়। ফলাফল হয়তো তাদের পক্ষে ছিল না, কিন্তু তারা দেখিয়ে দিয়েছে বিশ্বকাপ শুধু বড় দলগুলোর গল্প নয়।
হালান্ডের ভাইকিং রো উন্মাদনা
নরওয়ের হয়ে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেই ইতিহাস গড়েছেন আর্লিং হালান্ড। দলকে তাদের ইতিহাসের সেরা বিশ্বকাপ সাফল্য এনে দেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমেও ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
সমর্থকদের সঙ্গে তাঁর 'ভাইকিং রো' উদযাপন টুর্নামেন্টের অন্যতম প্রতীকী দৃশ্যে পরিণত হয়। কাল্পনিক ভাইকিং নৌকায় বৈঠা চালানোর ভঙ্গিতে এই উদযাপন দ্রুতই ভাইরাল হয়ে যায়। বিশ্বকাপ শেষে দেশে ফিরে একটি খেলনা র্যাকুন হাতে ছবি পোস্ট করে তিনি লেখেন, 'এটা আমার সঙ্গে বাড়ি পর্যন্ত চলে এসেছে।' সামাজিক মাধ্যমে সেটিও ব্যাপক সাড়া ফেলে।
ফকল্যান্ড বিতর্কে উত্তপ্ত সেমিফাইনাল
সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের ম্যাচটি কেবল ফুটবলের লড়াই ছিল না, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ভূরাজনৈতিক উত্তাপও। ম্যাচের আগে থেকেই ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ বা মালভিনা ইস্যু নিয়ে দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে আলোচনা ছিল তুঙ্গে।
ম্যাচ শেষে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের হাতে ফকল্যান্ড ইস্যুতে ব্যানার দেখা গেলে নতুন করে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। ইংল্যান্ডের আপত্তির পর বিষয়টি নিয়ে ফিফা ম্যাচ রিপোর্ট পর্যালোচনার কথা জানায়। বিশ্বকাপের মাঠে রাজনীতি কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, এই ঘটনাও তার একটি বড় উদাহরণ হয়ে থাকবে।
গল্পগুলোই বাঁচিয়ে রাখবে ২০২৬ বিশ্বকাপকে
১৬ বছর পর আবার বিশ্বকাপ ট্রফি উঠেছে স্পেনের হাতে। তবে এই আসরের স্মৃতি শুধু শিরোপাজয়ীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এমবাপ্পের গোলের রেকর্ড, আর্জেন্টিনার অদম্য লড়াই, কেপ ভার্দের রূপকথা, বালোগানকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক, হালান্ডের ভাইরাল উদযাপন কিংবা ফকল্যান্ড ইস্যুর উত্তাপ মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ হয়ে উঠেছে বহু গল্পের এক মহাকাব্য।
সময় গড়ালে স্কোরলাইন হয়তো অনেকের মনে ঝাপসা হয়ে যাবে। কিন্তু এই বিশ্বকাপের জন্ম দেওয়া গল্পগুলো ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে।