প্রকাশিত: ২০ জুলাই ২০২৬ , ১১:৫৫ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়তে থাকায় শ্রমঘণ্টা, উৎপাদনশীলতা ও মানুষের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে বাড়বে চিকিৎসা ব্যয়। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে সতর্ক করেছে জার্মানিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাডেলফি গ্লোবাল।
রোববার প্রকাশিত প্রতিষ্ঠানটির ‘হিট, হেলথ অ্যান্ড দ্য ইনক্রিজিং কস্টস অব লিভিং: এ কল ফর অ্যাকশন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের ব্যাপকতা, স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশ নিজস্ব অর্থে বহনের বাধ্যবাধকতা এবং সীমিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা বাংলাদেশের তাপপ্রবাহজনিত অর্থনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের কৃষি ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা তাপজনিত কারণে বছরে গড়ে ২৩ দশমিক ৭৫ কর্মদিবস হারাতে পারেন। বর্তমানে এ দুই খাতে কর্মঘণ্টা হারানোর হার ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ হলেও ২০৩০ সালের মধ্যে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
সব খাত মিলিয়ে কর্মঘণ্টা হারানোর হার একই সময়ে ৪ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। অসুস্থতাজনিত ছুটি, স্বাস্থ্য বীমা কিংবা আয় সুরক্ষার সুযোগ না থাকায় অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে।
বাংলাদেশ, ব্রাজিল, ফ্রান্স, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, নাইজেরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে পরিচালিত এ গবেষণায় বাংলাদেশকে তাপপ্রবাহের অর্থনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণায় দেখানো হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপপ্রবাহ একদিকে মানুষের কর্মক্ষমতা ও আয় কমায়, অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
স্বাস্থ্য ব্যয়ের ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশই মানুষকে নিজস্ব অর্থে বহন করতে হয়েছে, যা গবেষণাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। ২০০০ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে মাথাপিছু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় বেড়েছে ৮৩০ শতাংশেরও বেশি। তাপপ্রবাহজনিত অসুস্থতা বৃদ্ধি পেলে এ ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২০ থেকে ২০৩৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল উচ্চ থেকে অতি উচ্চ আর্দ্রতাজনিত তাপঝুঁকির মধ্যে থাকবে। এ সময়ে বছরে ১৮৩ থেকে ২৩৯ দিন তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকতে পারে। চরম তাপপ্রবাহের সময় কিছু খাতে উৎপাদনশীলতা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
এ ছাড়া দেশের কৃষি খাতে কর্মরত প্রায় সব নারীই অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ করেন। নির্মাণসহ অন্যান্য তাপঝুঁকিপূর্ণ খাতেও অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের হার বেশি। ফলে তাপপ্রবাহজনিত অসুস্থতার কারণে কর্মঘণ্টা কমে গেলে তাদের আয় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অ্যাডেলফি গ্লোবালের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চরম তাপপ্রবাহের কারণে শ্রমঘণ্টা ও উৎপাদনশীলতা কমে বাংলাদেশে সম্ভাব্য আয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় দুই হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৫ শতাংশের সমান।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তাপপ্রবাহের সময় বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়া এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট কর্মক্ষেত্র, কারখানা ও আবাসিক এলাকায় মানুষের তাপঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে। এ পরিস্থিতিতে জলবায়ু অভিযোজন, জনস্বাস্থ্য এবং শ্রমনীতিকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিবেদনে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয়ের ওপর নির্ভরতা কমানো, তাপপ্রবাহে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও শ্রম অধিকার সম্প্রসারণ, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় তাপ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করা এবং স্বাস্থ্য ও শ্রমিক সুরক্ষায় জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।