প্রকাশিত: ৩০ জুলাই ২০২৬ , ০৯:০৮ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান তাপদাহ এখন শুধু জনস্বাস্থ্যের নয়, অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। অতিরিক্ত গরমের কারণে শ্রম উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ায় ২০২৪ সালে দেশটির আনুমানিক ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশের সমান।
বিশ্বব্যাংকের নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিনের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলেই উৎপাদনশীলতার ক্ষতি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোতে চরম তাপমাত্রার প্রভাব এবং তা মোকাবিলায় সম্ভাব্য করণীয় নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তার পাশাপাশি অভিযোজনমূলক বিনিয়োগের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক কেন্দ্র ঢাকা তাপদাহের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাজধানীতে প্রতিবছর প্রায় ৩ শতাংশ কর্মঘণ্টা হারিয়ে যাচ্ছে, যা প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ উৎপাদনশীলতা ক্ষতির ইঙ্গিত দেয়। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৮০ সালের মধ্যে ঢাকায় হারানো উৎপাদনশীল সময়ের পরিমাণ বেড়ে ৭.৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পও জলবায়ুজনিত এই ঝুঁকির মুখে রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশন এবং কর্নেল ইউনিভার্সিটির এক যৌথ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তাপদাহ মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশসহ চারটি প্রধান পোশাক রপ্তানিকারক দেশ সম্মিলিতভাবে প্রায় ৬৫.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় হারাতে পারে।
তবে প্রতিবেদনে আশাবাদের জায়গাও তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের বিভিন্ন উদ্যোগকে ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কর্মপরিবেশ উন্নয়নের মাধ্যমে পোশাক শিল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশে আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ডের সনদপ্রাপ্ত পোশাক কারখানার সংখ্যা ২৭০-এর বেশি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তাপদাহের সামাজিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অতিরিক্ত গরমের কারণে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বাধার মুখে পড়ছেন নারী শ্রমিকেরা। এতে তাঁদের ওপর কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ, সহিংসতা ও নির্যাতনের ঝুঁকি বাড়ছে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়াই জলবায়ুজনিত তাপঝুঁকির মুখোমুখি। প্রতিবছর এই অঞ্চলে প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ পূর্ণকালীন কাজের সমপরিমাণ উৎপাদনশীলতা হারিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি প্রায় ৭ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।
এদিকে, ২০৭০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৫২ কোটি মানুষ বছরে অন্তত এক মাস বিপজ্জনক মাত্রার তাপমাত্রার মুখোমুখি হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাপদাহজনিত মৃত্যুর সংখ্যাও গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, তাপদাহ মোকাবিলা এখন কেবল পরিবেশগত ইস্যু নয়; এটি কর্মসংস্থান, নগর পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। উত্তাপসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, শ্রমবান্ধব কর্মপরিবেশ এবং টেকসই শিল্পায়নে বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই চ্যালেঞ্জকে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সুযোগে পরিণত করতে পারে।
প্রতিবেদনটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এখনই কার্যকর নীতি ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে।