এলিজা আজাদ

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬ , ০৬:১৮ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

রিকশার আয়না

দুপুরের রোদটা তখনো মাথার ওপর সোজা। কাশেম মিয়া রিকশাটা একটা গাছের ছায়ায় দাঁড় করিয়ে বিড়ি ধরাল। পাশেই একটা কফি শপ, কাচের দেয়ালের ভেতর দিয়ে দেখা যায় ছেলেমেয়েরা ল্যাপটপ খুলে বসে আছে, হাতে বরফ-ঠাণ্ডা কোনো পানীয়। কাশেম চোখ সরিয়ে নিল। এই দৃশ্যটা তার চেনা, প্রতিদিনের—তবু আজ কেন যেন ভেতরে একটা খচখচানি হলো।

সকালে বাসা থেকে বেরোনোর সময় তার মেয়ে বলেছিল, বাবা, স্কুলের ফি তিন হাজার টাকা লাগবে, কাল দিতে হবে। কাশেম মাথা নেড়ে বেরিয়ে এসেছে, কিন্তু হিসেবটা মাথায় ঘুরছে। সারাদিনে যা রোজগার হয়, তার অর্ধেকটাই যায় রিকশা মালিককে জমা দিতে। বাকিটায় সংসার। ফি-টা কোথা থেকে আসবে, সেটা এখনো ঠিক হয়নি।

একটা যাত্রী উঠল—মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক, হাতে ফাইল। "মতিঝিল যাব।" কাশেম রিকশা ঘোরাল। রাস্তায় যানজট, রোদ, ধুলো। ভদ্রলোক ফোনে কথা বলছেন কারো সাথে, গলায় বিরক্তি—কোনো একটা মিটিং, কোনো একটা ডিল ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা। কাশেম শুনছে, কিছু বুঝছে, কিছু বুঝছে না। শুধু এটুকু বোঝে যে এই মানুষটার দুশ্চিন্তাও আছে, তার নিজেরও আছে—কিন্তু দুটো দুশ্চিন্তা কখনো একই রাস্তায় মুখোমুখি হয় না, পাশাপাশি বসেও না।

মতিঝিল পৌঁছে ভদ্রলোক ভাড়া মেটালেন, দশ টাকা কম দিলেন। "ভাংতি নাই মামা, রাখো।" কাশেম কিছু বলল না। এরকম প্রায়ই হয়। প্রতিবাদ করলে যাত্রী হারানোর ভয়, আবার চুপ থাকলে নিজের কাছে নিজের একটা ছোট হওয়া। দুটোর মধ্যে সে রোজ একটা বেছে নেয়—আজও নিল।

বিকেলের দিকে বৃষ্টি নামল হঠাৎ। কাশেম রিকশা থামিয়ে একটা টিনের চালার নিচে দাঁড়াল। পাশে আরেকজন রিকশাওয়ালা, বয়সে ছোট, নাম রফিক। দুজনে চুপচাপ বৃষ্টি দেখছিল। রফিক হঠাৎ বলল, "মিয়া ভাই, শুনছেন? নতুন একটা অ্যাপ আসছে, মোবাইলে অর্ডার নিয়া মানুষ আনবো নাকি। রিকশাও নাকি অ্যাপে বুক হইব এখন।"

কাশেম একটু হাসল, কিন্তু হাসিটায় আনন্দ ছিল না। "আমাগো তো মোবাইলই ভালো চালাইতে পারি না।"

"হ। ওরা কইব দক্ষতা বাড়াও। কিন্তু দক্ষতা বাড়ানোর সময়টা কে দিব, রুটিটা কে দিব সেই সময়ে?"

কথাটা বাতাসে ভেসে রইল, বৃষ্টির শব্দের সাথে মিশে। কাশেম তাকিয়ে রইল সামনের রাস্তার দিকে, যেখানে পানি জমে একটা ছোট আয়নার মতো তৈরি হয়েছে। সেই আয়নায় উল্টো হয়ে ভেসে আছে ঢাকা শহরের সাইনবোর্ড, বিজ্ঞাপনের আলো, আর মাথার ওপরের মেঘলা আকাশ।

বৃষ্টি থামলে কাশেম আবার রিকশায় উঠল। মেয়ের ফি-র কথাটা এখনো মাথায়। আজ রাতে হয়তো মালিকের কাছে হাত পাততে হবে, নয়তো পাশের বাসার ভাবির কাছে। দুটোই লজ্জার, তবু বাছাই করতে হবে একটা।

প্যাডেলে চাপ দিতে দিতে কাশেম ভাবল, শহরটা বদলাচ্ছে ঠিকই—কাচের দেয়াল উঠছে, অ্যাপ আসছে, নতুন নতুন সাইনবোর্ড জ্বলছে রাতে। কিন্তু তার প্যাডেল ঘোরানোর ভঙ্গিটা একই আছে, বিশ বছর ধরে। বদল যা হয়, সেটা তার মাথার ওপর দিয়ে যায়, তাকে ছুঁয়ে যায় না।

রাস্তার ওপর জমে থাকা পানির আয়নাটা ততক্ষণে রিকশার চাকায় ভেঙে গেছে, ছড়িয়ে গেছে অসংখ্য টুকরোয়।