এখন সময় ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৮ জুলাই ২০২৬ , ০৯:৩৭ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

ইরানের তেল বিক্রির সুবিধা বাতিল করল যুক্তরাষ্ট্র

যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানের তেল বিক্রির জন্য দেওয়া বিশেষ অনুমতিও বাতিল করেছে ওয়াশিংটন। এই দুই পদক্ষেপের পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়।

মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র এ পদক্ষেপ নেয়।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, অভিযানে ইরানের ৮০টির বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ৬০টির বেশি ছোট নৌযান ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা। এছাড়া উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা অবকাঠামো, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের অবস্থান এবং ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্রও হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল।

সেন্টকমের ভাষ্য, ইরানের সামরিক তৎপরতা যুদ্ধবিরতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। এ কারণেই ইরানকে "উচ্চ মূল্য" দিতে বাধ্য করতে এই অভিযান চালানো হয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলাকে "নগ্ন আগ্রাসন" হিসেবে আখ্যা দিয়েছে ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স। সংস্থাটি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের মার্কিন হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না এবং এ হামলার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।

এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বুধবার ভোরে দেশটির প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ, কেশম দ্বীপ, সিরিক এবং বন্দর আব্বাস এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। সিরিকে একটি বাণিজ্যিক জেটিতে আঘাত হানা একটি প্রক্ষেপণের ধ্বংসাবশেষে কয়েকজন আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মাছ ধরার নৌঘাট ও কয়েকটি মাছ ধরার নৌকাও।

খার্গ দ্বীপ থেকে ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করা হয়। তবে সেন্টকম তাদের বিবৃতিতে ওই স্থাপনায় হামলার কথা উল্লেখ করেনি।

সামরিক অভিযানের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানির জন্য দেওয়া বিশেষ সাধারণ লাইসেন্সও বাতিল করেছে। গত ২২ জুন জারি করা ওই লাইসেন্সের আওতায় ইরানকে আগস্ট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য বিক্রির সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৭ জুলাইয়ের মধ্যে সব ধরনের লেনদেন গুটিয়ে ফেলতে হবে।

এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তকে যুদ্ধবিরতির কাঠামোগত সমঝোতার লঙ্ঘন বলে অভিযোগ করেছে। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, জাতীয় নিরাপত্তা ও দেশের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং এর পরিণতির দায় যুক্তরাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।

অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার ঘটনায় কাতার সরাসরি ইরানকে দায়ী করেছে। দোহার অভিযোগ, 'আল রেকাইয়াত' নামে কাতারের একটি এলএনজিবাহী জাহাজে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে, যাতে জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষে আগুন লাগে। যদিও নাবিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। একই সময়ে ওমান উপকূলের কাছে সৌদি আরবের পতাকাবাহী একটি সুপারট্যাংকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি মেনে চলছে। তবে ইরানের সঙ্গে সমন্বয় না করে নির্ধারিত নৌপথের বাইরে চলাচল করলে বাণিজ্যিক জাহাজ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

উল্লেখ্য, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু গত সপ্তাহে কাতারে অনুষ্ঠিত পরোক্ষ আলোচনা কোনো অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হয়। এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ইরানের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "হয় আমরা একটি চুক্তিতে পৌঁছাব, নয়তো কাজ শেষ করে দেব।"

এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হুমকির ভাষা অব্যাহত রাখলে স্থায়ী চুক্তি নিয়ে কোনো আলোচনাই শুরু হবে না।