এখন সময় ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ ডিসেম্বার ২০২৫ , ০৫:৫৩ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

ইতিহাসের পাতায় বঙ্গবন্ধু উপাধি ও দুই ব্যক্তিত্বের গল্প

বাঙালি জাতির ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শব্দটি শেখ মুজিবুর রহমানের নামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত হলেও এই উপাধির শেকড় আরও গভীরে প্রোথিত। ইতিহাসের পুরনো নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, শেখ মুজিবুর রহমানের অন্তত ৭৮ বছর আগে এই বাংলারই আরেকজন সমাজ সংস্কারক ও ধর্ম প্রচারক মুন্সী মেহেরুল্লাহকে প্রথম বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। ১৮৯১ সালে প্রখ্যাত লেখক ও সংস্কারক মির্জা ইউসুফ আলী তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ দুগ্ধ সরোবর-এর ভূমিকায় মেহেরুল্লাহর জনসেবা ও মমত্ববোধের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে এই বিশেষ নামে আখ্যায়িত করেন। সাতক্ষীরার শ্যামনগর সরকারি মহসীন কলেজের শিক্ষক ড. মো. জহুরুল ইসলাম তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভে রেফারেন্সসহ এই ঐতিহাসিক তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

মুন্সী মেহেরুল্লাহ ১৮৬১ সালে যশোরে জন্মগ্রহণ করেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই নিজের মেধা ও স্বাধীনচেতা মনোভাবের কারণে সমকালীন সমাজে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। ব্রিটিশ আমলের মিশনারি তৎপরতার বিরুদ্ধে কলম ধরা এবং ধর্মসভার মাধ্যমে গণমানুষের মাঝে ধর্মীয় ও সামাজিক সচেতনতা তৈরির কারিগর হিসেবে তাকে গণ্য করা হয়। গবেষক নাসির হেলালের মতে, মেহেরুল্লাহকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেওয়া একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য এবং তৎকালীন মুসলিম মনীষীরাও তাকে এই নামে সম্বোধন করতেন। সমাজ সংস্কারে তার অসামান্য অবদানের জন্য তিনি কর্মবীর ও মোসলেমহিতৈষী নামেও পরিচিত ছিলেন। ১৯০৭ সালে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে ইন্তেকাল করা এই মানুষটির নামে যশোরে বর্তমানে মেহেরুল্লাহ ময়দান, রেলওয়ে স্টেশন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসভায় তৎকালীন ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে দেওয়া এই খেতাবটি দ্রুতই দেশজুড়ে জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং জাতীয় পরিচিতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। তবে রাজনৈতিক বিবর্তনের ধারায় ১৯৭৩ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় পুলিশের গুলিতে ছাত্র নিহতের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ডাকসুর তৎকালীন ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের নেতৃত্বে শেখ মুজিবুর রহমানের বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা উপাধি প্রত্যাহারের একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। ৩ জানুয়ারি ১৯৭৩-এর দৈনিক বাংলা পত্রিকায় এ সংক্রান্ত সংবাদ সে সময় সারা দেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে একটি টকশোতে শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের বিপরীতে আবারও বঙ্গবন্ধু উপাধি ব্যবহারের মাধ্যমে পাল্টা যুক্তি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৮৯১ সালের মুন্সী মেহেরুল্লাহ থেকে শুরু করে ১৯৬৯ সালের শেখ মুজিব পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু উপাধিটি কেবল একটি পদবি নয়, বরং এটি বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের এক বিশাল দলিল। এই উপাধির ইতিহাস আমাদের একই সঙ্গে সমাজ সংস্কারের এক পুরনো অধ্যায় এবং আধুনিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রামের বিবর্তনের কথা মনে করিয়ে দেয়।