প্রকাশিত: ০৫ মে ২০২৬ , ০৭:৫৪ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মনস্তাত্ত্বিক স্বাধীনতার মধ্যকার দ্বান্দ্বিক সম্পর্কটি আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম জটিল একটি বিষয়। আমরা যখন 'গণমাধ্যমের স্বাধীনতা' নিয়ে উচ্চকণ্ঠ হই, তখন সাধারণত একটি বাহ্যিক অবকাঠামোর কথা কল্পনা করি, যেখানে রাষ্ট্র বা কোনো বিশেষ গোষ্ঠী গণমাধ্যমের ওপর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করবে না। কিন্তু গভীরতর বিশ্লেষণে দেখা যায়, গণমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং কার্যকরী হলো গণমাধ্যমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক স্বাধীনতা। তিনি সংবাদিক, সম্পাদক কিংবা নীতিনির্ধারক যেই হোক।
এই স্বাধীনতা কোনো আইনি কাঠামোর কারণে নয় বরং এটি একটি ব্যক্তির দীর্ঘদিনের নৈতিক চর্চা, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা এবং সাহসিকতার ফসল। রাষ্ট্রীয় আইন বা সাংবিধানিক রক্ষাকবচ গণমাধ্যমকে একটি স্বাধীন ক্ষেত্র প্রদান করতে পারে ঠিকই, কিন্তু সেই ক্ষেত্রে বিচরণকারী ব্যক্তিটি যদি অভ্যন্তরীণভাবে শৃঙ্খলিত থাকেন, তবে সেই কাঠামোগত স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়ে। ফরাসি দার্শনিক জঁ পল সার্ত্রে স্বাধীনতার যে অস্তিত্ববাদী সংজ্ঞা দিয়েছিলেন, তার আলোকে বলা যায়, একজন সংবাদকর্মী যখন সচেতনভাবে তার বিবেককে পাশ কাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন তিনি আসলে নিজের স্বাধীনতাকেই বিসর্জন দেন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একটি বাহ্যিক শর্ত, আর স্বাধীন মানসিকতা হলো একটি অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা। এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধানটিই বর্তমান বিশ্বের সাংবাদিকতার প্রধানতম সংকটের জায়গা। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিশ্বের অনেক দেশে অত্যন্ত বৈরী আইন ও সেন্সরশিপের মধ্যেও কিছু সংবাদকর্মী তাদের স্বাধীন মানসিকতার জোরে এমন সব সত্য উন্মোচন করেছেন যা ক্ষমতার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, চরম উদারপন্থী ও স্বাধীন সংবিধানেও অনেক গণমাধ্যম মালিক বা সাংবাদিক স্বেচ্ছায় ক্ষমতার দাসত্ব গ্রহণ করেছেন কেবল তাদের মানসিক পরাধীনতার কারণে। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের উইকিলিকস পর্যন্ত প্রতিটি বড় ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গণমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার চেয়েও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সত্য প্রকাশ করার অদম্য মানসিক ইচ্ছাটিই ছিল প্রধান চালিকাশক্তি। মার্কিন সাংবাদিক এডওয়ার্ড আর. মুরো একবার বলেছিলেন, 'একটি জাতি যদি ভীতুদের দ্বারা শাসিত হয়, তবে তার গণমাধ্যমও ভীতু হয়ে পড়ে।' এখানে 'ভীতু' হওয়াটি একটি মানসিক অবস্থা, যা কোনো আইনি সুরক্ষা দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়। গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের এই স্বাধীন মানসিকতার অভাবের পেছনে প্রধানত কাজ করে অর্থনৈতিক স্বার্থ, রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ এবং সামাজিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা। যখন একজন সম্পাদক তার কাগজের নীতি নির্ধারণের চেয়ে তার ব্যবসায়িক স্বার্থকে অধিক গুরুত্ব দেন, তখন তিনি আসলে তার স্বাধীন মানসিকতাকে বন্ধক রাখেন। মিডিয়া লিটারেসির জনক হিসেবে পরিচিত মার্শাল ম্যাকলুহান বলেছিলেন, 'মাধ্যমই হলো বার্তা'। বর্তমান সময়ে এই মাধ্যমের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে দাঁড়িয়েছে বার্তা প্রেরকের নিজস্ব পক্ষপাত। একজন সাংবাদিক যখন কোনো ঘটনার সংবাদ পরিবেশন করেন, তখন তার অবচেতন মনে কাজ করা সংস্কার, রাজনৈতিক আদর্শ কিংবা ব্যক্তিগত অনুরাগ সেই সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতাকে গ্রাস করে ফেলে। একে বলা হয় 'কনফারমেশন বায়াস' বা নিজের বিশ্বাসের অনুকূলে তথ্য সংগ্রহ করা। এই পক্ষপাতিত্ব থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজন একটি সংস্কারমুক্ত স্বাধীন মন। স্বাধীন গণমাধ্যমের ধারণার চেয়ে স্বাধীন মানসিকতার গুরুত্ব অধিক হওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো প্রযুক্তির গণতান্ত্রিকায়ন। বর্তমানে ইন্টারনেটের যুগে যে কেউ তথ্য প্রকাশ করতে পারেন, কিন্তু সেই তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নির্ভর করে ব্যক্তির নৈতিক মেরুদণ্ডের ওপর। এডমন্ড বার্ক যখন গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন, তখন তার ভাবনায় ছিল এমন এক গোষ্ঠী যারা কোনো প্রলোভন বা ভয়ে সত্য থেকে বিচ্যুত হবে না। কিন্তু আজ আমরা দেখছি 'কর্পোরেট মিডিয়া' বা 'স্পন্সরড জার্নালিজম'-এর জয়জয়কার। যেখানে বিনিয়োগকারীর স্বার্থই চূড়ান্ত নীতি হিসেবে বিবেচিত হয়। এই পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার চেয়েও জরুরি হয়ে পড়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের পেশাদারিত্ব ও চারিত্রিক দৃঢ়তা। একজন স্বাধীন মানসিকতার সাংবাদিক জানেন যে, তথ্যের চেয়েও সত্য বড় এবং সত্যের চেয়েও বড় হলো ন্যায়বিচার। নোয়াম চমস্কি তার 'ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট' তত্ত্বে দেখিয়েছেন কীভাবে গণমাধ্যম সচেতনভাবে জনমতকে নিয়ন্ত্রণ বা উৎপাদন করে। এই জনমত উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা যখন যন্ত্রের মতো অংশ নেন, তখন তারা আসলে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেন। তারা তখন স্রেফ একটি সিস্টেমের অংশ হয়ে যান। এই সিস্টেম থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রয়োজন তথাকথিত নিরপেক্ষতার খোলস ছেড়ে প্রকৃত বস্তুনিষ্ঠতার পথে হাঁটা। বস্তুনিষ্ঠতা মানে কেবল উভয় পক্ষের কথা বলা নয় বরং সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস রাখা। প্রাচীন ভারতের চাণক্য থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের হানা আরেন্ডট পর্যন্ত সবাই ক্ষমতার সত্য ভাষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের স্বাধীন মানসিকতা মানে হলো সত্যের মুখোমুখি হওয়ার এবং সেই সত্যকে মানুষের কাছে অবিকৃতভাবে পৌঁছে দেওয়ার এক আধ্যাত্মিক শক্তি। যখন কোনো সংবাদকর্মী আত্মতুষ্টিতে ভোগেন কিংবা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর তল্পিবাহক হতে আনন্দ পান, তখন তিনি প্রকৃতপক্ষে নিজের পেশার অমর্যাদা করেন। বর্তমান বিশ্বে আমরা দেখি যে, অনেক সময় রাষ্ট্রীয় চাপের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় গণমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ সেন্সরশিপ। মালিকপক্ষের রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট অনেক সময় গণমাধ্যমকে ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, একজন স্বাধীনচেতা সম্পাদক চাইলে অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তার প্রকাশনার মান অক্ষুণ্ণ রাখতে পারেন। এটি একটি চারিত্রিক ঋজুতার বিষয়। ওয়াল্টার লিপম্যান তার 'পাবলিক অপিনিয়ন' গ্রন্থে জনমত গঠনের যে জটিল প্রক্রিয়ার বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে সাংবাদিকের ব্যক্তিগত দর্শনের প্রভাব অত্যন্ত প্রকট। একজন সাংবাদিক যদি নিজে স্বাধীন না হন, তবে তিনি কখনো সমাজকে স্বাধীনতার পথে পরিচালিত করতে পারেন না। স্বাধীন মানসিকতা কেবল তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করে না বরং এটি তথ্যের প্রাসঙ্গিকতাও নিশ্চিত করে। কোন খবরটি গুরুত্বপূর্ণ এবং কোনটি স্রেফ বিনোদন বা দৃষ্টি সরানোর কৌশল, তা নির্ধারণ করার জন্য প্রয়োজন একটি তীক্ষ্ণ ও বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মস্তিষ্ক। আধুনিক সমাজে আমরা তথ্যের ভারে ন্যুব্জ, কিন্তু জ্ঞানের অভাবে রিক্ত। এই জ্ঞানের আলো কেবল তারাই দিতে পারেন যাদের চিন্তা ও চেতনায় কোনো শেকল নেই। গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের স্বাধীনতার এই সংকটটি কেবল পেশাগত নয় বরং এটি একটি গভীর অস্তিত্ববাদী সংকটও বটে। কারণ যখন একজন মানুষ তার পেশার মৌলনীতির সঙ্গে আপস করেন, তখন তিনি তার আত্মপরিচয়ের একটি বড় অংশ হারিয়ে ফেলেন। রবার্ট ফিস্ক বা জন পিলজারের মতো সাংবাদিকরা কেন স্মরণীয়? কারণ তারা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে বসে থাকেননি, বরং তারা তাদের স্বাধীন মানসিকতা দিয়ে প্রতিষ্ঠানের সীমানা বাড়িয়ে নিয়েছিলেন। অন্যদিকে, অনেক বড় বড় মিডিয়া হাউজ আজ বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাচ্ছে কেবল তাদের মেরুদণ্ডহীন সাংবাদিকতার কারণে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অর্জিত হয় সংগ্রামের মাধ্যমে, কিন্তু স্বাধীন মানসিকতা অর্জিত হয় নিজের সাথে যুদ্ধের মাধ্যমে। নিজের ভেতরের ক্ষুদ্র স্বার্থ, মোহ এবং ভয়কে জয় করার মাধ্যমেই এই মানসিকতা তৈরি হয়। সুতরাং একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণে আমরা যদি কেবল সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নৈতিক উন্নয়ন ও চিন্তার স্বাধীনতার বিষয়টি অবহেলা করি, তবে সেই ফলাফল হবে অপূর্ণ। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য আইন প্রয়োজন, কিন্তু সেই স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রয়োজন আলোকিত ও স্বাধীন মানুষ। একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কোনো গ্যারান্টি দেয় না যে সমাজ সঠিক তথ্য পাবে, কিন্তু একজন স্বাধীন মানসিকতাসম্পন্ন সংবাদকর্মী নিশ্চিত করতে পারেন যে শত বাধার মধ্যেও মানুষ অন্তত সত্যের সুবাস পাবে। এই বৈশ্বিক যুগে যখন তথ্যই সবচেয়ে বড় পুঁজি, তখন সেই পুঁজির অপব্যবহার রোধ করার একমাত্র উপায় হলো গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের বিবেক জাগ্রত করা। তাদের বুঝতে হবে যে তারা কোনো পণ্যের বিক্রেতা নন বরং তারা জনস্বার্থের অতন্দ্র প্রহরী। এই পাহারাদারি করার জন্য যে সাহসিকতা প্রয়োজন, তার উৎস হলো স্বাধীন চিন্তার সক্ষমতা। পরিশেষে বলা যায়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার দাবিটি একটি রাজনৈতিক ও আইনি আকাঙ্ক্ষা, কিন্তু স্বাধীন মানসিকতার দাবিটি একটি মানবিক ও নৈতিক অনিবার্যতা। যতক্ষণ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাদের মনোজগতকে সংকীর্ণতা ও দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে না পারবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত হাজারো স্বাধীন গণমাধ্যম আইনও সমাজে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবে না। তাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় আহ্বান হলো: গণমাধ্যমকে নয়, বরং গণমাধ্যমকর্মীদের চিন্তার জগতকে স্বাধীন ও সার্বভৌম করা। তবেই আমরা একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং সুন্দর আগামীর প্রত্যাশা করতে পারি। এই স্বাধীন মানসিকতাই পারে তথ্যের অন্ধকার গলি থেকে সত্যকে খুঁজে এনে জনসম্মুখে উপস্থাপন করতে, যা প্রকারান্তরে একটি জাতির বিবেককে জাগ্রত রাখার প্রধান পাথেয় হয়ে দাঁড়াবে। গণমাধ্যম যদি হয় দেহের মতো, তবে স্বাধীন মানসিকতা হলো তার প্রাণ। প্রাণহীন দেহ যেমন সচল থাকতে পারে না, তেমনি স্বাধীন মানসিকতাহীন গণমাধ্যমও মৃতপ্রায় এক কাঠামোর চেয়ে বেশি কিছু নয়। এই চিরন্তন সত্যটি অনুধাবন করা এবং তা পালনের মধ্য দিয়েই সাংবাদিকতার প্রকৃত সার্থকতা নিহিত। একটি সমাজ বা রাষ্ট্র যখন তার মিডিয়া সংশ্লিষ্টদের নির্ভীক ও স্বাধীন চিন্তার সুযোগ দেয় না বা সংশ্লিষ্টরা নিজেরাই যখন সেই সুযোগ নিতে ভয় পায়, তখন সেই সমাজ মেধাহীন ও লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে বাধ্য। তাই আমাদের সংগ্রামের অভিমুখ হওয়া উচিত বাহ্যিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতার দিকেও। এই দ্বিমুখী স্বাধীনতার মিলন ঘটলেই কেবল গণমাধ্যম তার ঐতিহাসিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা পূরণ করতে সক্ষম হবে। যা একই সাথে আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তিকেও করবে সুদৃঢ় ও অজেয়। গণমাধ্যম এবং তার কর্মীদের এই পারস্পরিক ও পরিপূরক স্বাধীনতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামীর পৃথিবীর বুদ্ধিবৃত্তিক সমৃদ্ধির চাবিকাঠি। এটি কেবল পেশাদারিত্বের বিষয় নয় বরং এটি একটি নৈতিক ও মানবিক অঙ্গীকার যা রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার। এই দৃষ্টিভঙ্গিই হোক আধুনিক গণমাধ্যমের চালিকাশক্তি। কারণ শেষ বিচারে, কোনো স্বাধীন প্রতিষ্ঠান নয় বরং স্বাধীন মানুষেরাই ইতিহাস নির্মাণ করে। আর গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা যদি সেই ইতিহাসের কারিগর হতে চান, তবে তাদের সবার আগে নিজের মনের গহীনে জমানো পরাধীনতার শেকলগুলো ভেঙে ফেলতে হবে। এই আত্মিক মুক্তিই হলো প্রকৃত স্বাধীনতা, যা কোনো আইনি সুরক্ষা বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী। এই পথেই নির্মিত হবে প্রকৃত গণমাধ্যমের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। গণমাধ্যমের ইতিহাসে যারা অমর হয়ে আছেন, তারা সবাই এই স্বাধীন মানসিকতারই ধারক ও বাহক ছিলেন। তাদের উত্তরসূরি হিসেবে আজকের সংবাদকর্মীদেরও এই একই পথে হাঁটতে হবে যদি তারা সত্যিই সমাজের আলোকবর্তিকা হতে চান। অন্যথায়, তথ্যের এই প্রবল জোয়ারে গণমাধ্যম কেবল একটি প্রচারযন্ত্র হয়েই থেকে যাবে, যা মানুষের মুক্তির পথ না দেখিয়ে বরং তাকে আরও বেশি বিভ্রান্ত করবে। তাই আজ সময় এসেছে স্বাধীন গণমাধ্যমের দাবির পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীদের স্বাধীন সত্তাকে জাগ্রত করার। এই আন্দোলনের শুরু হতে হবে ব্যক্তির ভেতর থেকে, যা ছড়িয়ে পড়বে সমগ্র প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে। তবেই সার্থকতা পাবে 'চতুর্থ স্তম্ভ' হিসেবে গণমাধ্যমের পরিচিতি এবং সমাজ ফিরে পাবে তার সঠিক দিকনির্দেশনা। এই লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হতে পারে, কিন্তু অসম্ভব নয়। প্রয়োজন কেবল নিজের প্রতি সততা এবং সত্যের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা। যা একজন সংবাদকর্মীকে দিতে পারে এক অসীম মানসিক স্বাধীনতা ও মর্যাদা। সেই মর্যাদাই হোক প্রতিটি গণমাধ্যমকর্মীর প্রধান লক্ষ্য ও আদর্শ। এই প্রবন্ধের মূল সুরটি তাই, বারবার এই কথাটিই মনে করিয়ে দিতে চাই যে, বাহ্যিক স্বাধীনতার চেয়ে অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা অনেক বেশি কার্যকর এবং এটিই সমাজ পরিবর্তনের মূল শক্তি। গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা যদি তাদের এই শক্তিকে চিনতে পারেন এবং এর সঠিক প্রয়োগ করেন, তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো দান হিসেবে নয় বরং একটি অর্জিত অধিকার হিসেবেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে।